বিশ্বজয়ী রিচা রাজ্য পুলিশের ডিএসপি, দিদি-দাদার সংবর্ধনা ‘ছোট মাহি’কে, একসুরে কামনা— বঙ্গকন্যা হোন ভারতের অধিনায়ক!

বাংলার গর্ব, ভারতের বিশ্বজয়ী ক্রিকেটার রিচা ঘোষ শনিবার পেলেন জীবনের অন্যতম বড় সম্মান। একদিকে সিএবি-র তরফে সোনার ব্যাট, ৩৪ লক্ষ টাকার চেক, অন্যদিকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান ও ডিএসপি পদে নিয়োগপত্র— সব মিলিয়ে ইডেন গার্ডেন্সে রিচার সংবর্ধনা যেন এক ইতিহাসের মুহূর্ত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়-এর উপস্থিতিতে সেই মুহূর্ত আরও গর্বিত হয়ে ওঠে। মঞ্চে একসঙ্গে বাংলার দুই ক্রিকেট আইকন— একজন অতীতের ‘দাদা’, আর অন্যজন বর্তমানের ‘ছোট মাহি’। দু’জনের কণ্ঠেই একই স্বর, “এক দিন রিচা যেন ভারতের অধিনায়ক হন।”
বিশ্বজয়ের পর বাংলার কন্যার সোনালি দিন
রিচা ঘোষ— শিলিগুড়ির মেয়ে। যিনি ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের হয়ে বিশ্বকাপ জিতে এনেছেন দেশের গর্ব। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বাঙালি মহিলা বিশ্বকাপজয়ী হিসেবে তাঁর নাম এখন সোনার অক্ষরে লেখা।
শনিবার ইডেনে তাঁর জন্য ছিল রাজকীয় আয়োজন। উত্তরীয়, পুষ্পস্তবক, মিষ্টি, স্মারক— সবকিছুর পর সিএবি রিচার হাতে তুলে দিল সোনার ব্যাট ও বল এবং ৩৪ লক্ষ টাকার চেক।
সৌরভ হাসতে হাসতে বললেন,
“রিচা বিশ্বকাপ ফাইনালে ৩৪ রান করেছিল। তাই ওর জন্য ৩৪ লক্ষ টাকা। রান যেমন করেছে, পুরস্কারও তেমনই।”
এর পর রাজ্য সরকারের তরফে মুখ্যমন্ত্রী নিজে রিচার গলায় সোনার হার পরিয়ে দেন এবং তুলে দেন ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান। পাশাপাশি দেন ডিএসপি পদে নিয়োগপত্র, অর্থাৎ এখন থেকে ‘বিশ্বজয়ী রিচা ঘোষ’ একই সঙ্গে হবেন “ডিএসপি রিচা ঘোষ”— রাজ্য পুলিশের একজন কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন :
SIR-এর জন্য এনুমারেশন ফর্ম ফিলআপ করবেন কীভাবে: বিস্তারিত নির্দেশিকা
লালবাজারের ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার’ সেজে ভয় দেখিয়ে টাকা তুলছিল এক যুবক
রাজ্য পুলিশের নতুন মুখ, গর্বের প্রতীক রিচা
ইডেনের মঞ্চে যখন রিচা দাঁড়িয়ে, তখন তাঁর চোখে-মুখে এক অন্যরকম উত্তেজনা। শিলিগুড়ি থেকে উঠে আসা এক মেয়ের এত বড় সাফল্যের পেছনে আছে বছরের পর বছর পরিশ্রম।
সংবর্ধনার আগে রিচা লালবাজারে গিয়ে রাজ্য পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের শুভেচ্ছা পান, কথা বলেন নিজের নতুন দায়িত্ব নিয়ে।
রাজ্য পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেন,
“রিচা শুধু ক্রিকেটে নয়, মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক। তাঁকে ডিএসপি পদে পেয়ে আমরা গর্বিত।”
মঞ্চে দিদি ও দাদা একসঙ্গে, লক্ষ্য এক — অধিনায়ক রিচা
শিলিগুড়ির মেয়ে থেকে রাজ্য পুলিশের অফিসার! রিচা ঘোষের জীবনের অবিশ্বাস্য সাফল্য!
মঞ্চে একসঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা, প্রাক্তন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী, অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী সহ আরও অনেকে।
সৌরভ বলেন,
“রিচা ছ’নম্বরে নেমে যেভাবে রান করে, সেটা সবচেয়ে কঠিন জায়গা। বল কম পায়, কিন্তু রান করতে হয় অনেক। ওর স্ট্রাইক রেটই এই বিশ্বকাপে ভারতের জয়ের বড় কারণ।”
(উল্লেখ্য, রিচার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৩.৩৪— এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ।)
তারপরেই সৌরভের আবেগঘন মন্তব্য—
“এক দিন যেন বলতে পারি, ভারতের অধিনায়ক রিচা ঘোষ। সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যোগ করেন,
“ওর উপর কোনও চাপ দিতে চাই না। ও যেভাবে এগোচ্ছে, তাতেই বাংলার গর্ব। আমি চাই, এক দিন ভারতের অধিনায়ক হিসেবে ও দেশের নেতৃত্ব দিক।”
বঙ্গভূষণ থেকে সোনার হার— বাংলার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান
রিচার গলায় যখন মুখ্যমন্ত্রী নিজে সোনার হার পরিয়ে দেন, তখন গোটা ইডেন হাততালিতে ফেটে পড়ে। মমতা বলেন,
“এই বাংলার মেয়েরা এখন বিশ্বজয়ী। রিচা আজ আমাদের সকলের প্রেরণা। এই সম্মান বাংলার তরুণ প্রজন্মের জন্য।”
সিএবি সভাপতির পক্ষ থেকে আরও ঘোষণা করা হয়—
“হাওড়ার ডুমুরজলায় তৈরি হবে বিশ্বমানের ক্রিকেট অ্যাকাডেমি।”
এই অ্যাকাডেমির কাজ আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন সৌরভ। তাঁর আশা, এখান থেকে আরও অনেক রিচা উঠে আসবে ভবিষ্যতে।
আরও পড়ুন :
রবিবার ভোর ৫টা থেকে বন্ধ থাকবে দ্বিতীয় হুগলি সেতু! জানুন কোন পথে চলবে যানবাহন
রিচার আবেগঘন প্রতিক্রিয়া — “এই সম্মান আমার পরিবারের”
ইডেনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রিচা বলেন,
“এটা শুধু আমার নয়, আমার মা-বাবার, আমার কোচ, আমার দলের— সবার সম্মান। আমি শুধু মাঠে যা পারি করেছি। দেশের জন্য খেলাই আমার লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন,
“নেটে আমি সব সময় কঠিন পরিস্থিতির অনুশীলন করি। ম্যাচে যাতে কোনও ভয় না থাকে। আমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি।”
সহ-খেলোয়াড়েরা তাঁকে ডাকেন ‘ছোট মাহি’, কারণ তাঁর ছক্কা মারার ধরন অনেকটা মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো।
হাসতে হাসতে রিচা বলেন,
“ছোটবেলায় দুধ খেতাম, এখন আর খাই না। কিন্তু ধোনির মতো দলকে জেতানোই আমার আনন্দ।”
তিনি জানান, বিশ্বকাপের সোনার মেডেল তিনি বাড়ির ট্রফি ক্যাবিনেটের একদম সামনে রাখবেন। “ওটাই আমার প্রেরণা,” বলেন রিচা।
সৌরভের মুখে বাংলার ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন,
“বাংলার ক্রিকেট এখন নতুন যুগে প্রবেশ করছে। আমরা মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বমানের সুযোগ দিতে চাই। রিচার মতো মেয়েরা আমাদের ভবিষ্যতের মুখ।”
তিনি জানান, রাজ্য সরকারের সহায়তায় ডুমুরজলায় তৈরি হচ্ছে এক অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সমান সুযোগ পাবে।
ঝুলনের স্মৃতিচারণ — “আমার দেখা সেরা প্রতিভা রিচা”
ভারতের প্রাক্তন তারকা ঝুলন গোস্বামী বলেন,
“২০১৩ সালে সিএবি-কে বলেছিলাম, জেলা থেকে প্রতিভা তুলে আনতে চাই। সেই বছর ট্যালেন্ট হান্টের সময়েই প্রথম রিচাকে দেখি। ও ছিল অসাধারণ প্রতিভা। আমি জানতাম, একদিন ও অনেক দূর যাবে।”
তবে ঝুলন জানান, রিচাকে সিনিয়র দলে আনতে প্রথমে অনেক বাধা ছিল।
“অনেকে বলেছিল, ওর বয়স কম। কিন্তু আমি জানতাম, প্রতিভার কোনও বয়স হয় না। সিএবি পাশে ছিল, তাই সম্ভব হয়েছিল।”
আজ ইডেনে দাঁড়িয়ে সেই রিচা বিশ্বজয়ী। ঝুলনের গলায় গর্ব ঝরে পড়ল—
“এখান থেকে রিচার নতুন লড়াই শুরু। এটা শেষ নয়, শুরু মাত্র।”
রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বার্তা
অরূপ বিশ্বাস বলেন,
“রিচা প্রমাণ করেছে, সুযোগ দিলে বাংলার মেয়েরাও বিশ্ব জয় করতে পারে। রাজ্য সরকার মেয়েদের ক্রীড়ার পরিকাঠামো আরও উন্নত করবে।”
আরও পড়ুন :
হাওড়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড! সাতসকালে বাঁকড়ার বাদামতলার জামাকাপড় মার্কেটে আগুন পুড়ল সব কিছু
বিশ্বকাপ থেকে ইডেন — সোনালি পথচলা
ভারতের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে কখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। অথচ তাঁর সভাপতিত্বে, বাংলার মেয়েই প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিল দেশকে।
এই মুহূর্ত যেন এক কাকতালীয় অথচ ঐতিহাসিক অধ্যায়।
রিচা নিজেও বলেন,
“ছোটবেলায় আমি টিভিতে দাদার খেলা দেখতাম। আজ দাদার হাত থেকে পুরস্কার পাচ্ছি। এটা আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত।”
মুখ্যমন্ত্রীর সৌরভকে উদ্দেশ করে বার্তা
অনুষ্ঠানের শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“আমি জানি সৌরভ হয়তো রাগ করবে, কিন্তু আমি বলব— ওর আইসিসি-র প্রধান হওয়া উচিত ছিল। একদিন সেটা হবেই, ওকে আটকাতে পারবে না কেউ।”
এই মন্তব্যে গোটা ইডেন আবারও হাততালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
রিচার ভবিষ্যৎ — লক্ষ্য ভারতকে আরও গৌরব দেওয়া
সংবর্ধনার পর সাংবাদিকদের রিচা বলেন,
“আমি এখন শুধু আরও ভালো খেলার কথা ভাবছি। দেশকে জেতানোই আমার আসল লক্ষ্য। অধিনায়ক হওয়া বা পদ— সেগুলো সময়ই বলবে।”
তিনি আরও বলেন,
“বাংলার মেয়েরা যেন দেখে— স্বপ্ন দেখলে সত্যিই সম্ভব।”
বাংলার গর্ব, ভারতের ভবিষ্যৎ
আজ বাংলার ঘরে ঘরে উচ্চারিত হচ্ছে একটাই নাম— রিচা ঘোষ।
তিনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি প্রমাণ করেছেন স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সাহসের মিশেল কীভাবে এক তরুণীকে বিশ্বজয়ের মঞ্চে তুলে আনতে পারে।
যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী, সৌরভ ও ঝুলন একসঙ্গে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে স্পষ্ট— রিচা এখন কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি বাংলার প্রেরণার প্রতীক।
