কুমারী পূজা: ইতিহাস গুরুত্ব আচার-বিধি ও সমাজে এর তাৎপর্য

কুমারী পূজা: ইতিহাস গুরুত্ব আচার-বিধি ও সমাজে এর তাৎপর্য

Spread the love

কুমারী পূজা: ইতিহাস গুরুত্ব আচার-বিধি ও সমাজে এর তাৎপর্য

কুমারী পূজা: ইতিহাস গুরুত্ব আচার-বিধি ও সমাজে এর তাৎপর্য

দুর্গাপূজার কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের আওয়াজ আর প্যান্ডেলের ঝলমলে আলো। তবে এই উৎসবের মধ্যে একটি বিশেষ আচার আছে, যা শুধু ভক্তির নয়, সমাজ ও সংস্কৃতিরও প্রতীক। সেটাই হলো কুমারী পূজা। এই পূজার মূল বিশ্বাস হলো – নারীই শক্তি, নারীই দেবী, নারীই মা দুর্গার প্রতিরূপ

আজ আমরা এই লেখায় সহজ ভাষায় জানব কুমারী পূজা কী, কেন হয়, এর ইতিহাস, আচার-বিধি, বর্তমান সমাজে এর গুরুত্ব আর আমাদের জীবনে এর বার্তা।

কুমারী পূজা কী?

কুমারী পূজা মানে হলো এমন এক কন্যাকে পূজা করা, যিনি এখনও বিবাহিত নন এবং শৈশব বা কৈশোরে আছেন। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, প্রতিটি নারীর ভেতরেই মা দুর্গার এক একটি রূপ বিরাজমান। তাই নবমী বা অষ্টমীর দিনে কন্যা বালিকাকে দুর্গারূপে পূজা করে তাঁকে অন্ন, বস্ত্র ও আশীর্বাদ দেওয়া হয়।

অনেকেই বলে থাকেন –
“যে ঘরে কুমারী পূজা হয়, সে ঘরে কখনো অশুভ শক্তি প্রবেশ করতে পারে না।”

কুমারী পূজার ইতিহাস

কুমারী পূজার প্রচলন বহুকাল আগের। পুরাণ মতে, স্বয়ং শ্রী রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে দেবী দুর্গাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই পূজা করেছিলেন। আবার আদ্যাশক্তি-র উপাসনায়ও কুমারী পূজা ছিল একটি প্রধান আচার।

স্বামী বিবেকানন্দ কুমারী পূজাকে সমাজে জনপ্রিয় করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “নারীকে দেবীজ্ঞান করো, তাহলেই জাতির উন্নতি হবে।” ১৮৯৮ সালে বেলুড় মঠে প্রথম কুমারী পূজা শুরু হয়েছিল তাঁর উদ্যোগে। আজও সেই রীতি বজায় আছে।

কুমারী পূজার আচার-বিধি

কুমারী পূজা করার নিয়ম কিছুটা বিশেষ।

  1. কুমারী নির্বাচন – সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের কন্যাদের মধ্যে থেকে একটি বেছে নেওয়া হয়।

    • ১ বছরের কন্যাকে সন্ধ্যা,

    • ২ বছরের কন্যাকে সার্বাণী,

    • ৩ বছরের কন্যাকে ত্রিধা,

    • ১০ বছরের কন্যাকে সুবর্না,

    • আর ১৬ বছরের কন্যাকে অম্বিকা বলা হয়।

  2. স্নান ও সজ্জা – কুমারীকে শুদ্ধ জলে স্নান করানো হয় এবং নতুন বস্ত্র পরানো হয়।

  3. পূজা মণ্ডপে বসানো – কুমারীকে মায়ের সিংহাসনের কাছে বসানো হয়, কপালে সিঁদুর, হাতের আঙুলে আলতা দিয়ে সাজানো হয়।

  4. পূজা শুরু – মন্ত্রোচ্চারণ, ধূপ, প্রদীপ, ফুল দিয়ে তাঁকে দেবীরূপে পূজা করা হয়।

  5. অঞ্জলি ও প্রসাদ – পূজা শেষে ভক্তরা কুমারীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন এবং তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন।

কুমারী পূজার দার্শনিক অর্থ

কুমারী পূজা: ইতিহাস গুরুত্ব আচার-বিধি ও সমাজে এর তাৎপর্য

কুমারী পূজা কেবল একটি আচার নয়, এর ভেতরে গভীর দার্শনিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

  • নারীশক্তির স্বীকৃতি – নারীকে শুধু সংসারের অঙ্গ নয়, তাঁকে দেবীরূপে মান্য করা।

  • পবিত্রতা ও নিষ্পাপ মন – শিশুকন্যার ভেতরে থাকা সরলতা ও পবিত্রতাই আসলে দেবীর আসল রূপ।

  • সমতার শিক্ষা – দরিদ্র হোক বা ধনী, কুমারী নির্বাচনে তার কোনো ভেদাভেদ নেই।

সমাজে কুমারী পূজার গুরুত্ব

বর্তমান সময়ে কুমারী পূজা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজও সমাজে নারীকে অনেক সময় অবমূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এই পূজা মনে করিয়ে দেয় – নারী ছাড়া সৃষ্টি অসম্পূর্ণ। নারীই আদ্যাশক্তি।

শিশুকন্যাকে দেবীরূপে দেখে পূজা করলে সমাজে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সম্মান বাড়ে।

বিভিন্ন স্থানে কুমারী পূজা

  • বেলুড় মঠ – এখানে কুমারী পূজা বিশ্বজোড়া পরিচিত। অষ্টমীতে এখানে বিরাট আয়োজন হয়।

  • কামাখ্যা মন্দির, আসাম – শাক্ত উপাসনার অন্যতম কেন্দ্র। এখানেও কুমারী পূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।

  • গ্রামবাংলা – গ্রামের দুর্গাপূজায় আজও কুমারী পূজা এক অন্যতম অনুষ্ঠান।

আজকের দিনে কুমারী পূজা

যদিও নগর জীবনে অনেকেই ব্যস্ত, তবে দুর্গাপূজার সময় কুমারী পূজার আয়োজন ছোট-বড় বহু মণ্ডপেই দেখা যায়। এতে শুধু ভক্তিই নয়, সমাজে নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

কুমারী পূজা নিয়ে কিছু লোকবিশ্বাস

  1. যেদিন কুমারী পূজা হয়, সেদিন দেবী দুর্গা বিশেষভাবে খুশি হন।

  2. কুমারী পূজা করলে ঘরে অন্ন, ধন ও শান্তি আসে।

  3. পূজা শেষে কুমারীকে উপহার দিলে তা দেবীকে অর্পণ করার সমান ফল দেয়।

FAQ

প্রশ্ন ১: কুমারী পূজা কবে হয়?
👉 সাধারণত দুর্গাপূজার অষ্টমী বা নবমীর দিনে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশ্ন ২: কুমারী পূজা কেন করা হয়?
👉 নারীকে দেবীজ্ঞান করার জন্য এবং সমাজে নারীশক্তির গুরুত্ব বোঝাতে কুমারী পূজা করা হয়।

প্রশ্ন ৩: কুমারী পূজায় কাকে পূজা করা হয়?
👉 অবিবাহিতা কন্যাশিশুকে দেবী দুর্গার প্রতিরূপ ধরে পূজা করা হয়।

প্রশ্ন ৪: কুমারী পূজা প্রথম কোথায় শুরু হয়েছিল?
👉 পুরাণে উল্লেখ আছে, রামচন্দ্র রাবণবধের আগে কুমারী পূজা করেছিলেন। আধুনিককালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম শুরু করেন।

প্রশ্ন ৫: কুমারী পূজার গুরুত্ব কী?
👉 নারীশক্তিকে মর্যাদা দেওয়া, নিষ্পাপ মনকে দেবীরূপে মানা এবং সমাজে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা।

উপসংহার

কুমারী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আমাদের সমাজকে শেখায় – নারীকে মর্যাদা দাও, তাঁকে শক্তির আসনে বসাও। নারী মানে মা, বোন, কন্যা, স্ত্রী – তাঁদের ভেতরেই লুকিয়ে আছেন মা দুর্গা।

আজকের দিনে যখন নারী নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রশ্ন উঠছে প্রতিনিয়ত, তখন কুমারী পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় – নারীই শক্তি, নারীই জীবন, নারীই দেবী।

আরও পড়ুন

👉 আজ অষ্টমীতে মা দুর্গার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য করণীয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *