শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

Spread the love

শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

মানুষের জীবনে ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান এবং বিশ্বাসের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণ এবং লোককথায় বারবার উঠে এসেছে সপ্তাহের প্রতিটি দিনের আলাদা মাহাত্ম্য। সেই ধারাবাহিকতায় শনিবার বা শনিবারকে ঘিরে রয়েছে নানা কাহিনী, ব্রত, পূজা এবং ধর্মীয় আচারের গুরুত্ব। বিশেষ করে হিন্দুধর্মে শনিবারের দিন শনি দেবের পূজা, হনুমানজির পূজা এবং বিশেষ ব্রত পালনের রীতি প্রচলিত।

আজকের এই লেখায় আমরা বিস্তারিত জানব—শনিবারের মাহাত্ম্য, শনি দেবের ক্রোধ ও কৃপা, এই দিনে পালিত ব্রত ও পূজার প্রয়োজনীয়তা এবং এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিকগুলো।

শনিবার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সপ্তাহের প্রতিটি দিন কোনো না কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। যেমন সোমবার মহাদেবের দিন, মঙ্গলবার হনুমানজির দিন, আবার শুক্রবার মা লক্ষ্মীর দিন। ঠিক তেমনই শনিবারকে বলা হয় শনি দেবের দিন

  1. শনি দেবের প্রভাব:
    জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী, শনি গ্রহ মানুষের কর্মফল প্রদানকারী গ্রহ। মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা, ধন-দৌলত, স্বাস্থ্য সব কিছুর উপরেই শনি গ্রহের গভীর প্রভাব রয়েছে।

  2. শনি ও ন্যায়বিচার:
    শাস্ত্রে শনি দেবকে বলা হয় “ন্যায়ের প্রতীক”। তিনি ভালো কাজের জন্য আশীর্বাদ দেন, আবার খারাপ কাজের জন্য কঠোর শাস্তিও দেন। তাই শনিবারের দিন শনি দেবকে সন্তুষ্ট করা মানে জীবনে দুঃখ-কষ্ট কমানো এবং সৌভাগ্য লাভ করা।

  3. শনির দৃষ্টি ও প্রভাব:
    অনেক সময় শনি দোষ (যেমন শনি সাড়ে সাতি, ঢেয়াড়িয়া বা অষ্টম শনি) জীবনে দুঃখ, আর্থিক ক্ষতি, রোগ, মানসিক অশান্তি নিয়ে আসে। বিশ্বাস করা হয়, শনিবারের পূজা-পাঠের মাধ্যমে সেই অশুভ প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।

শনিবারের ব্রত

শনিবারে ব্রত পালন করলে শনি দেব খুশি হন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই ব্রতের বিভিন্ন ধরন রয়েছে:

  1. শনিবার উপবাস ব্রত:
    অনেকেই এই দিনে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন বা উপবাস থাকেন। কেউ কেউ শুধু ফল, দুধ বা জল খেয়ে দিন কাটান।

  2. কালো তিল ও তেলের দান:
    শনি দেবকে তুষ্ট করতে এই দিনে কালো তিল, তিলের তেল, কালো কাপড় ও লোহা দান করার বিশেষ প্রথা আছে।

  3. প্রদীপ প্রজ্জ্বলন:
    সন্ধ্যায় শনি মন্দিরে বা বটগাছের নীচে তিলের তেলের প্রদীপ জ্বালানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে শনি দেবের কৃপা লাভ হয় এবং জীবনের অন্ধকার দূর হয়।

  4. শনি ব্রতকথা পাঠ:
    শনিবারে শনি ব্রতকথা শোনার বা পড়ার রীতি আছে। এই কাহিনীতে শনির মাহাত্ম্য ও ভক্তের কাহিনী বর্ণিত হয়।

শনিবারের পূজা

শনিবারের পূজা শুধু শনি দেবের নয়, হনুমানজিরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

  1. শনি দেবের পূজা:

    • শনি মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করা।

    • শনি দেবের প্রতিমায় তিলের তেল অর্পণ করা।

    • কালো উড়দ ডাল, কালো তিল ও লোহা দান করা।

    • শনি স্তোত্র বা শনি চালীসা পাঠ করা।

  2. হনুমানজির পূজা:
    বিশ্বাস করা হয়, হনুমানজির আরাধনায় শনির অশুভ প্রভাব কমে যায়। তাই শনিবারে হনুমান মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর, তেল ও লাড্ডু অর্পণ করার রীতি আছে।

  3. বটগাছ পূজা:
    অনেক জায়গায় শনিবারে মহিলারা বটগাছ পূজা করেন। বটগাছকে অমরত্বের প্রতীক ধরা হয় এবং এতে পারিবারিক সুখ-শান্তি আসে বলে বিশ্বাস।

শনিবারের সঙ্গে যুক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আচার

শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

  1. দান ধর্ম:
    এই দিনে গরিব ও অভাবীদের খাবার, কাপড়, টাকা, কালো তিল বা তেল দান করলে শুভ ফল পাওয়া যায়।

  2. কালো রঙের মাহাত্ম্য:
    শনি দেবকে খুশি করতে কালো রঙের ব্যবহার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনেকেই শনিবারে কালো পোশাক পরেন বা কালো জিনিস দান করেন।

  3. প্রাণী-পাখিকে আহার:
    বিশেষ করে কাক ও কুকুরকে খাবার দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। কারণ, কাককে যমদূতের প্রতীক ধরা হয় এবং কুকুর শনি দেবের বাহন।

শনিবারের পুরাণকথা ও শাস্ত্রীয় উল্লেখ

  1. শনি দেবের জন্মকথা:
    পুরাণ অনুযায়ী, শনি দেব সূর্যদেব ও ছায়াদেবীর পুত্র। জন্ম থেকেই তিনি তপস্যায় লিপ্ত ছিলেন। তাঁর কঠোর দৃষ্টি এমনকি সূর্যদেবকেও প্রভাবিত করেছিল।

  2. শনি ও হনুমানের কাহিনী:
    রামায়ণে উল্লেখ আছে, রাবণের বন্দী হনুমানজিকে শনির প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন। হনুমানজি শনি দেবকে পরাজিত করে প্রতিশ্রুতি নেন যে, যে ভক্ত তাঁকে পূজা করবে, তার উপর শনি দেব অযথা কষ্ট চাপাবেন না।

  3. শনি ও ভক্তের কাহিনী:
    বিভিন্ন শাস্ত্রে শনি ব্রতের মাহাত্ম্য নিয়ে বহু কাহিনী আছে। এক ভক্তের নিষ্ঠা ও পূজায় শনিদেব এতটাই খুশি হন যে, তাঁর কষ্ট দূর করে দেন।

শনিবারের ব্রত পালনের সুফল

  1. শনির অশুভ প্রভাব কমে যায়।

  2. জীবনে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।

  3. স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং রোগব্যাধি দূর হয়।

  4. পারিবারিক কলহ কমে গিয়ে সম্পর্ক মজবুত হয়।

  5. কর্মক্ষেত্রে উন্নতি এবং অর্থলাভ হয়।

আধুনিক সমাজে শনিবারের গুরুত্ব

আজকের দিনে অনেকেই ব্রত-উপবাসে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, এই বিশেষ দিনে কিছু নিয়ম মেনে চলা মানুষকে মানসিক শক্তি দেয়। উপবাস শরীরকে শুদ্ধ করে, দান মানুষের মধ্যে সহানুভূতি বাড়ায়, আবার পূজা মানসিক প্রশান্তি দেয়।

শনিবারের ব্রত ও পূজার মাহাত্ম্য: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিন?

❓ FAQ

Q1: শনিবারে কেন ব্রত পালন করা হয়?
👉 শনিবার শনি দেবের দিন। এই দিনে ব্রত রাখলে ও পূজা করলে শনির অশুভ প্রভাব কমে এবং সৌভাগ্য আসে।

Q2: শনিবারে কোন দেবতার পূজা করা উচিত?
👉 প্রধানত শনি দেব ও হনুমানজির পূজা করা হয়। এছাড়াও বটগাছ পূজা করার প্রচলন আছে।

Q3: শনিবারে কী দান করলে শুভ ফল মেলে?
👉 কালো তিল, তিলের তেল, কালো কাপড়, লোহা, উড়দ ডাল এবং দরিদ্রকে খাদ্যদান বিশেষ শুভ বলে মনে করা হয়।

Q4: শনিবারে কোন খাবার খাওয়া উচিত নয়?
👉 অনেকেই শনিবারে মাংস-মাছ পরিহার করে নিরামিষ, ফল বা দুধ গ্রহণ করেন।

Q5: শনিবারের পূজা করলে কী ফল মেলে?
👉 শনির অশুভ প্রভাব কমে, স্বাস্থ্য ভালো হয়, কর্মক্ষেত্রে উন্নতি আসে এবং পারিবারিক শান্তি বজায় থাকে।

উপসংহার

শনিবার শুধুই একটি দিন নয়, এটি মানুষের কর্মফল, ন্যায় ও সততার প্রতীক। শনি দেব যেমন কঠোর, তেমনই তিনি ন্যায়পরায়ণ। তাঁর পূজা-পাঠ ও ব্রত পালনের মাধ্যমে আমরা শুধু অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাই না, বরং জীবনে ইতিবাচক শক্তিও অর্জন করি।

তাই শনিবারের দিনকে অবহেলা না করে, সৎ পথে চলা, সেবা করা, দান করা এবং ভক্তি সহকারে পূজা করা—এগুলোই আমাদের জীবনে সত্যিকারের সৌভাগ্য আনতে পারে।

আরও পড়ুন

👉 শনির কৃপা পাওয়ার সহজ উপায় – শনিবারেই করুন এই ৫টি কাজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *