লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

Spread the love

লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

ভূমিকা

বাংলার সংস্কৃতিতে লক্ষ্মী পূজা এক বিশেষ দিন। দুর্গাপূজার আনন্দ শেষ হতেই ঘরে ঘরে দেবী লক্ষ্মীর আগমনের অপেক্ষা শুরু হয়। হিন্দু ধর্মে দেবী লক্ষ্মী ধন, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি ও শান্তির দেবী হিসেবে পূজিত হন। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বাংলার প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ধন-সম্পদের দেবীর পূজা হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ধনী ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই থাকে সমান উৎসাহ। বাংলার আঞ্চলিক রীতিনীতি, লোকবিশ্বাস এবং পারিবারিক প্রথার সঙ্গে মিশে লক্ষ্মী পূজা হয়ে উঠেছে এক অনন্য আয়োজন।

লক্ষ্মী পূজার তাৎপর্য

দেবী লক্ষ্মীকে হিন্দু ধর্মে “ধন লক্ষ্মী”, “ধান লক্ষ্মী”, “গৃহলক্ষ্মী” ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। তিনি শুধু অর্থ নয়, সুখ-শান্তি, ফসল, ধান এবং পরিবারের মঙ্গলকামনায় পূজিত হন। পুরাণ মতে, দেবী সমুদ্র মন্থন থেকে উৎপন্ন হন এবং তিনি ভগবান বিষ্ণুর পত্নী। তাই বিষ্ণুভক্তরা লক্ষ্মী পূজা বিশেষ ভক্তিভরে করে থাকেন।

বাংলায় এই পূজার বিশেষ তাৎপর্য কারণ কৃষিনির্ভর সমাজে ধান, শস্য ও সমৃদ্ধি ছিল প্রধান সম্পদ। তাই দেবী লক্ষ্মীকে ধান-ধান্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। পূজার সময় ভক্তরা বিশ্বাস করেন, ঘরে যদি লক্ষ্মীর কৃপা থাকে তবে দারিদ্র্য বা অশান্তি কোনোদিন আসবে না।

পূজার প্রস্তুতি

লক্ষ্মী পূজার দিন সকালে বাড়ির লোকেরা প্রথমেই গোছগাছ শুরু করে। ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়, আঙিনায় আলপনা আঁকা হয় চাল দিয়ে। অনেক জায়গায় পদ্মফুলের নকশা আঁকা হয় যাতে বিশ্বাস করা হয় দেবী সেই পথ ধরে গৃহে প্রবেশ করবেন।

  • প্রধান উপকরণ:
    • পদ্মফুল ও পদ্মপাতা
    • শ্রীফল বা নারকেল
    • নতুন চাল, দুধ, দই, মধু
    • গঙ্গাজল
    • ধূপ, প্রদীপ
    • গোঁজার ধান (ধানের শীষ)
    • পঞ্জিকা অনুযায়ী মিষ্টি, ফল ও নানান উপাচার

প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে এই সব উপকরণ সংগ্রহ করা হয় ভক্তিভরে। সন্ধ্যার আগে পূজার আসন সাজিয়ে রাখা হয়। দেবীর প্রতিমা না এনে অনেকে আলপনায় আঁকা প্রতীক বা কুমারী মেয়ের প্রতীককেও পূজা করেন।

পূজার নিয়মাবলী

সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্মী পূজা শুরু হয়। পুরোহিত ডাকানো হয় অনেক বাড়িতে, তবে বহু পরিবার নিজেরাই পঞ্জিকা দেখে পূজা সম্পন্ন করেন।

  1. প্রথমে গৃহদেবতা ও গণেশের পূজা করা হয়।
  2. তারপর দেবী লক্ষ্মীর পাদপ্রদীপ স্থাপন করে তাঁর ধ্যান ও আহ্বান করা হয়।
  3. মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে দেবীকে দুধ, মধু, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।
  4. শঙ্খ বাজানো হয় এবং ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে চারদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
  5. ধান-ধান্যের আঁটি, আলপনা এবং প্রদীপের আলোয় পূজার পরিবেশ আলাদা মাত্রা পায়।

ভোগ ও প্রসাদ

লক্ষ্মী পূজার ভোগ আলাদা বিশেষ। মিষ্টির পাশাপাশি থাকে নতুন চালের খিচুড়ি, লুচি, নাড়ু, চিঁড়ে-মুড়ি, দুধ-দই, ফল ও মিষ্টান্ন। অনেক বাড়িতে মায়েরা নিজের হাতে বানান নারকেল নাড়ু, মোয়া, সন্দেশ ইত্যাদি। পূজা শেষে প্রসাদ সবাই ভাগ করে খায়। বিশ্বাস আছে, প্রসাদ খেলে ঘরে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।

গ্রামবাংলায় লক্ষ্মী পূজা

গ্রামবাংলায় লক্ষ্মী পূজার রূপ একেবারেই আলাদা। ধানের গোলা সাজানো হয় সুন্দর করে, যাতে দেবী সেখানে বসবাস করেন। গৃহিণীরা ধান, পাট, শাকসবজি, কলা ইত্যাদি সাজিয়ে রাখেন দেবীর সামনে। সন্ধ্যা হলে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি প্রদীপের আলোয় ঝলমল করে ওঠে। দেবী যেন সত্যিই প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করেছেন—এমন বিশ্বাস থেকেই এই আয়োজন।

শহুরে পূজা

লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

শহরে পূজা হয় কিছুটা আধুনিকভাবে। অনেক বাড়িতে প্রতিমা এনে পূজা করা হয়, আবার অনেক ক্লাব ও সংগঠনও এই পূজা করে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভক্তিমূলক গান, আরতি ইত্যাদির মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়।

লক্ষ্মী পূজা ও লোকবিশ্বাস

বাংলায় লক্ষ্মী পূজাকে কেন্দ্র করে নানান লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। যেমন—

  • পূজার দিনে কেউ বাড়ি থেকে ধান বা অন্ন বের করে না।
  • সেদিন ঘরে ঝগড়া করলে লক্ষ্মী রুষ্ট হন বলে মনে করা হয়।
  • অনেকে বিশ্বাস করেন, পূজার রাতে দেবী সত্যিই ঘরে আসেন এবং তাঁর কৃপায় ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়।

উৎসবের আনন্দ

লক্ষ্মী পূজা শুধু ধর্মীয় রীতিই নয়, পরিবারকে একত্রিত করারও দিন। সকলে মিলে ঘর সাজানো, আলপনা আঁকা, প্রসাদ তৈরি ও পূজার আয়োজন একে অপরকে কাছে আনে। ছোটরা প্রদীপ জ্বালাতে মেতে ওঠে, বড়রা ব্যস্ত থাকে পূজার নিয়ম মানতে। এই পারিবারিক মিলনই উৎসবের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

বর্তমান সমাজে লক্ষ্মী পূজার তাৎপর্য

আজকের দিনে ভোগ-বিলাস, ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতার মাঝেও লক্ষ্মী পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শান্তি, সমৃদ্ধি ও পারিবারিক ঐক্যের গুরুত্ব। শুধু অর্থ নয়, মানসিক শান্তি ও ভালোবাসাই প্রকৃত ধন—এই উপলব্ধিই পূজার মূল শিক্ষা।

 FAQ

Q1: ২০২৫ সালে লক্ষ্মী পূজা কবে হবে?
👉 ২০২৫ সালের আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

Q2: লক্ষ্মী পূজায় কী কী উপকরণ লাগে?
👉 পদ্মফুল, পদ্মপাতা, চাল, দুধ, দই, মধু, শ্রীফল, আলপনা, ধূপ-প্রদীপ, এবং নানান ফল-মিষ্টি লাগে।

Q3: লক্ষ্মী পূজা কেন করা হয়?
👉 দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ, সুখ-সমৃদ্ধি ও শান্তির দেবী। তাঁর পূজা করলে পরিবারের মঙ্গল ও ধন-ধান্যে ভরে ওঠে বলে বিশ্বাস।

Q4: গ্রামে ও শহরে লক্ষ্মী পূজার মধ্যে কী পার্থক্য?
👉 গ্রামে ধানের গোলায় ও আঙিনায় আলপনা দিয়ে পূজা হয়, শহরে বাড়ি ও ক্লাব মিলিয়ে আরও আধুনিক আয়োজন হয়।

Q5: লক্ষ্মী পূজায় কী ভোগ দেওয়া হয়?
👉 নারকেল নাড়ু, মোয়া, খিচুড়ি, লুচি, দুধ, দই, ফল ও নানা মিষ্টি ভোগ দেওয়া হয়

উপসংহার

লক্ষ্মী পূজা বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদে ঘরে আসে সুখ-সমৃদ্ধি ও শান্তি—এই বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। তাই দুর্গাপূজা শেষ হলেও আনন্দ থেমে থাকে না, লক্ষ্মী পূজা আবার নতুন করে বাঙালির মন ভরে দেয় আলোকময় উৎসবে।

আরও পড়ুন

👉 বেলুড় মঠে দশমী 2025 : দুর্গা মায়ের বিদায় বেলার আবেগঘেরা মুহূর্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *