কুমারী পূজা থেকে মহাভোগ: নবমীর বিশেষ আয়োজন কোথায় কোথায়

শরৎ এসেছে বাংলায়। আকাশে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা, গন্ধে ভরে ওঠেছে শিউলি ফুলের সুবাস, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় ঢাকের বাদ্যি আর শঙ্খের ধ্বনি। এই সময়টাই তো বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় সময় – দেবীপক্ষ। আর এই দেবীপক্ষের সবচেয়ে জমজমাট, সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিনটি হল মহানবমী।
নবমী মানে শুধু পূজার একদিন নয়। নবমী মানে হলো সেই সন্ধিক্ষণ, যখন কুমারী little girl-এর মধ্যে আমরা দর্শন পাই দশমহাবিদ্যার, যখন অস্ত্রে-শস্ত্রে সাজানো হয় মাকে, আর যখন চারিদিক কাঁপিয়ে তোলা ভোগের রান্নার গন্ধে করে ওঠে। আজকের এই লেখায়, আমরা একবার ঘুরে আসবো সেই সব জায়গা থেকে, যেখানে নবমীর আয়োজন হয়ে থাকে একটু আলাদা, একটু বিশেষভাবে। যেখানে কুমারী পূজার পবিত্রতা আর মহাভোগের জমজমাট আয়োজন মিলে তৈরি করে এক অপার বিস্ময়।
কুমারী পূজা – মায়ের সেই শিশুরূপের দর্শন
কুমারী পূজা থেকে মহাভোগ: নবমীর বিশেষ আয়োজন কোথায় কোথায়
নবমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল এই কুমারী পূজা। কথায় আছে, এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কোনো কুমারী মেয়ের মধ্যেই বিরাজ করেন মা দুর্গা। তিনি হলেন নারী শক্তির সেই চিরন্তন, সর্বোচ্চ রূপ যিনি সদ্য ফোটা একটি কুঁড়ির মতোই পবিত্র। এই পূজা দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে কিছু ঐতিহ্যবাহী ঠিকানায়।
১. বেলুড় মঠ, হাওড়া:
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর দফতর এই বেলুড় মঠে কুমারী পূজা হয় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও জাঁকজমকের সাথে। এখানকার পরিবেশটা একদম spiritual, গমগম করে। সাদা পোশাক পরিহিত সন্ন্যাসীরা মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকেন, আর তার মধ্যেই একটি ছোট্ট মেয়েকে সিংহাসনে বসিয়ে পূজা করা হয়। দেখলে মনে হবে, সত্যিই যেন মা নিজে একটি শিশুরূপে এসে উপস্থিত হয়েছেন। ভিড় একটু বেশি থাকে, তাই একটু আগে পৌঁছোলে ভালো দেখতে পাবেন।
২. বোড়ালের রানি রাসমণির বাড়ি:
কলকাতার ঠাকুরবাড়ি, ঠনঠনেপল্লি, আর বোড়াল – এই তিন জায়গায় রানি রাসমণির বাড়িতে হয় খুবই ঘরোয়া আর ঐতিহ্যবাহী কুমারী পূজা। এখানে প্রচুর মানুষ আসেন, কিন্তু পরিবেশটা একদম পারিবারিক ধরনের। পুরনো আমলের সেই আচার-অনুষ্ঠান, সোনা-দানার গহনা পরা কুমারী মেয়ে, এবং প্রাণপুরাণের পূজা – সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
৩. দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি:
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরে কুমারী পূজা হয় খুবই ধুমধাম করে। মন্দিরের ভিতরকার সেই 12 টি শিবমন্দিরের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে মনে হবে আপনি সময়ের কোনো গহ্বরে চলে এসেছেন। এখানকার পূজা দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে এককেন্দ্রিক হয়ে upasana করা যায়।
৪. কিছু পারিবারিক পূজা:
কলকাতা, হাওড়া, বা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার অনেক বনেদি বাড়িতেও আপনি কুমারী পূজার আয়োজন দেখতে পাবেন। যেমন, ব্যারাকপুরের কিছু বাড়ি, বা হুগলির গুপ্তিপাড়ার বাড়িগুলো। এগুলো খুঁজে বের করতে একটু স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কিন্তু এগুলোর সৌন্দর্য্য হলো এর সনাতনী রীতি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
সন্ধি পূজা – সেই রক্তচন্দনের মুহূর্ত
নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় সন্ধি পূজা। এটাই হলো পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির একটি। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়েই মা চণ্ডী রাক্ষস মহিষাসুর ও চণ্ড-মুণ্ড বধ করেছিলেন। 108টি পদ্মফুল, 108টি দীপ জ্বালিয়ে এই পূজা করা হয়। এই পূজা দেখার জন্য সেরা কিছু জায়গা হল:
১. কলকাতার বিখ্যাত বারোয়ারি পূজাগুলো:
যেমন, বড়বাজারের কুমারটুলি সার্বজনীন, সি.আই.টি রোডের বোসপুকুর লেকের পূজা, বা শোভাবাজারের নববারী। এগুলোতে সন্ধি পূজা হয় বিশাল আকারে। একসাথে 108টি প্রদীপ জ্বলতে দেখার দৃশ্য truly magical! হাজার হাজার মানুষ একসাথে ‘জয় মা’ ধ্বনি দেন, সেই আওয়াজে কাঁপতে থাকে চারিপাশ।
২. জগৎদল শ্মশানকালী মন্দির, বাগবাজার:
এটি একটি খুবই শক্তিপীঠ। এখানের সন্ধি পূজা হয় একটু ভিন্ন মাত্রায়। শ্মশানের পাশে হওয়ায় এখানকার spiritual energy একেবারে আলাদা। যারা একটু ভিন্নরকমের, intense অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য আদর্শ জায়গা।
৩. গুপ্তিপাড়া, হুগলি:
বাংলার প্রাচীন জমিদার বাড়িগুলোর জন্য বিখ্যাত গুপ্তিপাড়া। এখানকার Radhakanta Jew Temple বা অন্য বনেদি বাড়িগুলোতে সন্ধি পূজা হয় শতাব্দীপ্রাচীন রীতিতে। পুরনো আমলের সেই আলপনা, ধূপ-ধুনোর গন্ধ, এবং মন্ত্রপাঠের শব্দ আপনাকে নিয়ে যাবে অতীতে।
মহাভোগ – যখন প্রসাদে মিশে থাকে মায়ের কৃপা
এবার আসি সেই অংশে, যার জন্যে probably অনেকেরই নবমী দিনটা অপেক্ষায় কাটে মহাভোগ! নবমীর ভোগ হল এক কথায় রাজসিক। এখানে মাকে নিবেদন করা হয় মাংস-মাছসহ নানা ধরনের পদ। এই ভোগ দেখতে ও প্রসাদ পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে সেইসব জায়গায় যেখানে ভোগ রান্নার হয় এক বিশাল আয়োজন।
১. শোভাবাজারের রাজবাড়ি:
কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই রাজবাড়িতে নবমীর ভোগের আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। প্রচুর পরিমাণে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, তরকারি, চাটনি রান্না হয়। পুরনো সেই huge বাসন-কোসনে ভোগ সাজানো হয়, যা দেখার মাত্রাই এক আনন্দ।
২. সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার, বারাসাত:
এই প্রাচীন-তে আজও নবমীতে হাজার হাজার মানুষের জন্য ভোগের আয়োজন করা হয়। এখানকার মাংসের আর ভাতের স্বাদই আলাদা। স্থানীয় মানুষজন জানেন, এখানের ভোগের একটা আলাদা reputation আছে।
৩. পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ি:
কলকাতার আরেকটি বিখ্যাত বনেদি বাড়ি। এখানে নবমীর ভোগে প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি, মাংস, ছোলা, পায়েস ইত্যাদি বিতরণ করা হয়। ভিড় একটু বেশি, কিন্তু প্রসাদ পেয়ে গেলে সব কষ্ট ভুলে যাবেন।
৪. বিভিন্ন কমিউনিটি পূজা:
কলকাতা, হাওড়া, বা Howrah, Hooghly, North 24 Parganas-এর বিভিন্ন area-based পূজাগুলোতে মহাভোগের আয়োজন হয় mass scale-এ। যেমন, সান্ত্রাগাছির কোনও বড় পূজা, বা বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার কোনো আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার পূজা – সেখানে নবমীর ভোগে প্রসাদ হিসেবে প্রায়শই মুরগির মাংস বা খাসির মাংস দেওয়া হয়। স্থানীয় স্বাদের এক অনন্য সমন্বয় থাকে এখানে।
৫. বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যবাহী পূজা:
ঢাকার রমনা কালীমন্দির, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির বা সিলেট, চট্টগ্রাম, দিনাজপুরের বড় বড় মন্দিরগুলোতে নবমীর ভোগের আয়োজন হয় জমজমাট। বাংলাদেশে এই ভোগে স্থানীয় মাছ ও মাংসের ব্যবহার হয়ে থাকে, যার স্বাদ একেবারেই ইউনিক।
কোথায় কী দেখবেন – একটি ছোট গাইড
-
যদি strictly spiritual experience চান: বেলুড় মঠ বা দক্ষিণেশ্বরে কুমারী পূজা দেখুন।
-
যদি ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে চান: বোড়ালের রাসমণির বাড়ি বা গুপ্তিপাড়ার বনেদি বাড়িগুলোতে যান।
-
যদি উৎসবের জমজমাট atmosphere উপভোগ করতে চান: কলকাতার any বিখ্যাত বারোয়ারি পূজায় সন্ধি পূজা দেখুন।
-
আর যদি ভোগের রাজসিক সমারোহ দেখতে ও taste করতে চান: শোভাবাজার রাজবাড়ি, বা আপনার local area-র any বড় সার্বজনীন পূজায় চলে যান নবমীর সকাল-বিকেল।
FAQ
Q: কুমারী পূজা কী এবং কেন করা হয়?
A: কুমারী পূজা হলো এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কন্যাকে দেবী দুর্গার রূপে পূজা করা। এটি নারী শক্তির পবিত্রতম রূপের প্রকাশ। মনে করা হয় কুমারী মেয়ের মধ্যে মা দুর্গা বিরাজ করেন।
Q: নবমীর দিন কোথায় কুমারী পূজা দেখতে পাওয়া যায়?
A: প্রধানত বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি, বোড়ালের রানি রাসমণির বাড়ি এবং বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে কুমারী পূজা দেখা যায়।
Q: মহাভোগ বলতে কী বোঝায়?
A: নবমীর দিন মাকে নিবেদন করা বিশেষ ভোগকে মহাভোগ বলে। এতে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, তরকারি, চাটনি, পায়েস সহ多种 পদ থাকে।
Q: কলকাতায় নবমীর মহাভোগ পাওয়ার সেরা জায়গা কোনগুলো?
A: শোভাবাজারের রাজবাড়ি, পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার বারাসাত এবং বিভিন্ন বড় বারোয়ারি পূজায় মহাভোগ পাওয়া যায়।
Q: সন্ধি পূজা কী এবং কোথায় দেখতে পাওয়া যায়?
A: নবমী ও দশমীর সন্ধিক্ষণে করা পূজাই সন্ধি পূজা। বড়বাজারের কুমারটুলি, বোসপুকুর লেক, শোভাবাজারের নববারী এবং জগৎদল শ্মশানকালী মন্দিরে সন্ধি পূজা দেখা যায়।
Q: বাংলাদেশে নবমীর বিশেষ আয়োজন কোথায় দেখতে পাওয়া যায়?
A: ঢাকার রমনা কালীমন্দির, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, সিলেট, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুরের বড় মন্দিরগুলোতে নবমীর বিশেষ আয়োজন হয়।
Q: নবমীর ভোগে সাধারণত কী কী থাকে?
A: ভাত, মাছের ঝোল, খাসির মাংস, মুরগির কারি, ডাল, সবজি, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি থাকে। জায়গাভেদে পদগুলোর variation থাকে।
Q: কুমারী পূজা দেখার সেরা সময় কোনটি?
A: সাধারণত নবমীর সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে কুমারী পূজা করা হয়। ভিড় এড়াতে সকাল সকাল চলে যাওয়া ভালো।
শেষ কথা
মহানবমী আসলে শক্তির উৎসব। এই দিনে মা একইসঙ্গে এক কোমল কুমারী মেয়ে, আবার একইসাথে রণরঙ্গিণী চামুণ্ডা। তিনি ভক্তের হাতে গ্রহণ করেন একটি মিষ্টির প্রসাদ, আবার গ্রহণ করেন একটি বলির আত্মনিবেদন। কুমারী পূজা থেকে মহাভোগ – এই পুরো journey টাই হলো জীবনের এক অপূর্ব রূপক। আমরা সবাই তো জীবনের নানান রকমের লড়াইয়ে জড়িয়ে আছি। নবমী আমাদের শেখায়, আমাদের ভিতরেও আছে এক অপরাজেয় শক্তি। সেই শক্তিকেই আমরা salutation করি এই দিনে।
