দুর্গাপূজা মানেই শুধু উৎসব নয় আবেগের গল্প

দুর্গাপূজা বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু এই উৎসব কেবল চারদিন আনন্দ করার দিন নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য আবেগ, স্মৃতি আর গল্প। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বাঙালির জীবনে দুর্গাপূজা মানেই নতুন জামার গন্ধ, মণ্ডপে আলো, ধূপকাঠির ধোঁয়া, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের তালে তালে আনন্দ, আবার কখনো বিদায়ের বেদনা। তাই তো বলা হয়— দুর্গাপূজা মানেই শুধু উৎসব নয়, আবেগের গল্প।
শৈশবের দুর্গাপূজা: নতুন জামার আনন্দ
শিশুদের কাছে দুর্গাপূজা মানেই একরাশ আনন্দ। সারা বছর অপেক্ষার পর এই কয়েকটা দিনে হাতে নতুন জামা পরে বাইরে বেরোনোর মজা অন্যরকম। বাবা-মা, কাকা-মাসির কাছ থেকে উপহার পাওয়ার আনন্দ, প্রতিদিন কোন পোশাকটি পরব সেই নিয়ে উত্তেজনা—এসবই শৈশবের দুর্গাপূজার অমূল্য অংশ।
বাড়ির ছাদে বসে দূর থেকে আলোকসজ্জা দেখা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্যান্ডেল ঘুরতে যাওয়া, হাতে ফুচকা বা কটন ক্যান্ডি—এসব মুহূর্ত গড়ে তোলে শৈশবের মিষ্টি স্মৃতি।
কলেজ জীবনের দুর্গাপূজা: বন্ধু আর আড্ডার উৎসব
কিশোরবেলা পেরিয়ে যখন কলেজে পৌঁছনো যায়, তখন দুর্গাপূজা একেবারেই অন্য স্বাদ নিয়ে আসে। এই সময়ে দুর্গাপূজা মানে—বন্ধুদের সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রাতভর প্যান্ডেল হপিং, চা-সিঙ্গাড়ার আড্ডা, আর কখনো প্রেমের প্রথম হাতছানি।
রাত জেগে মণ্ডপ দেখা, ফটো তোলা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া আবার মিলেমিশে যাওয়া—এসবই আবেগের গল্প। এই বয়সে দুর্গাপূজা শুধু উৎসব নয়, জীবনের বিশেষ স্মৃতি তৈরি করে।
মায়ের দুর্গা: বাড়ির আঙিনার পূজা
কলকাতা কিংবা গ্রাম, প্রতিটি বাড়িতে দুর্গাপূজার সময়ে একটা আলাদা পরিবেশ তৈরি হয়। ঘরের বড়রা পূজোর আয়োজন করেন, ঠাকুর ঘরে সাজানো হয় ধূপ-ধুনো-ফুল। মায়েরা ভোরবেলা উঠে চন্দন মেখে ফুল দিয়ে ঠাকুর সাজান। সন্তানরা পাশে দাঁড়িয়ে দেখে মায়ের ভক্তি।
এই সময়েই বোঝা যায়—দুর্গা কেবল দেবী নন, তিনি মা। তাঁর আগমন মানে বাড়িতে মঙ্গল, শান্তি, আর এক ধরনের নিরাপত্তা।
ঢাকের তালে আবেগের উথাল-পাথাল
ঢাকের শব্দ ছাড়া দুর্গাপূজা কল্পনাই করা যায় না। বিসর্জনের আগে ঢাক বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখ ভিজে ওঠে। শঙ্খের ধ্বনি, উলুধ্বনি, কাশফুলের দোল—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা যেন এক আবেগের মিশেল।
প্রতিবার অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার সময় মনে হয় যেন নিজের সমস্ত কষ্ট, আশা-আকাঙ্ক্ষা দেবীর কাছে সমর্পণ করা যাচ্ছে।
প্যান্ডেল হপিং-এর স্মৃতি
কলকাতার দুর্গাপূজা মানেই থিম পুজো আর আলোকসজ্জা। প্রতিটি প্যান্ডেল যেন এক একটি শিল্পকর্ম। তবে শুধু সাজসজ্জা নয়, ভিড়ের মধ্যেও মানুষের উচ্ছ্বাস, অচেনা লোকের সঙ্গে একসঙ্গে ঠাকুর দেখা—এসবই আলাদা অভিজ্ঞতা।
বন্ধুদের সঙ্গে নির্ঘুম রাত, হাতে কাগজের পাখা, গরমে ঘেমে যাওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি প্রতিমা দেখার আনন্দই আলাদা।
খাবারের টান
দুর্গাপূজা মানেই খাওয়া-দাওয়ার উৎসবও বটে। খিচুড়ি-লাবড়ার প্রসাদ থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, কাটলেট, ফুচকা, আইসক্রিম—সবই যেন পুজোর অংশ।
অনেকেই বলেন, দুর্গাপূজার সময় খাওয়া-দাওয়া না করলে পূজা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অষ্টমী-নবমীর আবেগ
অষ্টমীর অঞ্জলি বাঙালির কাছে বিশেষ। সকালে ভিড় জমে যায় প্রতিটি মণ্ডপে। হাতে বেলপাতা, মুখে মন্ত্র—মনে হয় দেবীর কাছে শান্তির প্রার্থনা করা হচ্ছে।
নবমী রাতের সিঁদুরখেলা, হাসি-ঠাট্টার মাঝেও চোখের কোনে জল। কারণ, এরপরই আসছে বিদায়ের ক্ষণ।
বিসর্জনের বেদনা
দুর্গাপূজা মানেই শুধু উৎসব নয় আবেগের গল্প
দশমী মানেই বিদায়। মা ফিরে যান কৈলাসে। ঢাকের তালে, উলুধ্বনি আর চোখ ভেজানো বিদায় দৃশ্য যেন প্রত্যেক বছর নতুন করে মনে দাগ কেটে যায়।
“আসছে বছর আবার হবে”—এই কথায় আশার আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু মায়ের চলে যাওয়ার কষ্ট যেন সারাবছর থেকে যায়।
প্রবাসে দুর্গাপূজা: অন্যরকম গল্প
যারা দূরে থাকে, তাদের কাছে দুর্গাপূজা মানে একেবারেই অন্য আবেগ। বিদেশে থাকা বাঙালিরা মিলেমিশে পূজা করেন। যদিও কলকাতার ভিড় নেই, তবুও মায়ের আগমন তাদের মনে বাড়ির মতোই আনন্দ জাগায়।
প্রবাসে দুর্গাপূজা মানে একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে বাড়ির জন্য হাহাকার।
কেন দুর্গাপূজা কেবল উৎসব নয়
দুর্গাপূজা একদিকে সামাজিক মিলনক্ষেত্র, আবার অন্যদিকে পারিবারিক বন্ধনের উৎস। মা দুর্গার আগমন মানে কেবল দেবী পূজা নয়, একসঙ্গে থাকার আনন্দ, ভালোবাসার বন্ধন, এবং স্মৃতির ভাঁড়ার।
প্রতিবার দুর্গাপূজা এসে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা একা নই। পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এই উৎসব আমাদের যুক্ত করে।
তাই দুর্গাপূজা মানেই কেবল উৎসব নয়—এটা আবেগের গল্প, স্মৃতির সঞ্চয়, এবং বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন প্রতীক।
✅ FAQ
Q1. কেন বলা হয় দুর্গাপূজা কেবল উৎসব নয়, আবেগের গল্প?
👉 কারণ দুর্গাপূজায় শুধু আনন্দ নয়, পরিবার-বন্ধুদের একত্রিত হওয়া, শৈশবের স্মৃতি, বিদায়ের কষ্ট—সব মিলিয়ে এক গভীর আবেগ জড়িয়ে থাকে।
Q2. দুর্গাপূজার কোন কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি টানে?
👉 নতুন জামার আনন্দ, প্যান্ডেল হপিং, অঞ্জলি, ঢাকের তালে নাচ, প্রসাদ, আর দশমীর বিসর্জনের মুহূর্ত মানুষকে সবচেয়ে টানে।
Q3. প্রবাসে দুর্গাপূজা কেমন হয়?
👉 প্রবাসে দুর্গাপূজা কলকাতার মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও বাঙালিরা একত্রিত হয়ে উৎসব করেন। আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির জন্য হাহাকারও থাকে।
Q4. দুর্গাপূজা বাঙালির সংস্কৃতিতে কী ভূমিকা রাখে?
👉 দুর্গাপূজা বাঙালির সামাজিক, পারিবারিক আর সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক। এই উৎসব বাঙালিকে একত্রিত করে।
উপসংহার
দুর্গাপূজা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য গল্প। নতুন জামা, প্যান্ডেল হপিং, প্রসাদ, অঞ্জলি, বিদায়—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা আমাদের আবেগেরই প্রতিফলন।
তাই যখনই শোনা যায়—“মা আসছেন”—তখন বুকের মধ্যে আনন্দের ঢেউ ওঠে। আবার যখন বিদায় নেন, তখন চোখের জল আটকানো যায় না।
