দীপাবলি করলে মঙ্গল – ঘরে আসবে শুভ শক্তি

দীপাবলি বা দীপোৎসব শুধু আলোর উৎসব নয়, এটি সুখ-সমৃদ্ধি, শান্তি ও শুভ শক্তি আহ্বানের অন্যতম সময়। প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে যদি নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে কাজ করা যায়, তবে দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় জীবনে আসবে সৌভাগ্য, পারিবারিক শান্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নতি। সহজ ভাষায় আজ আমরা জানব, দীপাবলির দিন কী কী করলে সত্যিই মঙ্গল আসবে।
দীপাবলির মাহাত্ম্য
দীপাবলি মানেই আলো, দীপাবলি মানেই অন্ধকার দূর করা। আমাদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট, অশুভ শক্তি, কলহ—সবকিছু দূর করে আলোর পথে নিয়ে যায় এই উৎসব। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, অমাবস্যার অন্ধকার রাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ আলোকের আহ্বান জানায়। এই দিনেই ভগবান রাম অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন রাবণকে বধ করে। তখন সমস্ত অযোধ্যাবাসী ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজাকে বরণ করেছিলেন। সেই থেকে দীপাবলির শুরু।
দীপাবলির দিনে যা করলে মঙ্গল আসবে
১. ঘর পরিষ্কার রাখা
দীপাবলির আগে ঘরবাড়ি ভালোভাবে ঝাড়পোঁছ করা খুব জরুরি। বিশ্বাস করা হয়, দেবী লক্ষ্মী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে প্রবেশ করেন। ধুলো-ময়লা বা জঞ্জাল থাকলে দেবী সেখানে আসেন না। তাই উৎসবের আগে ঘর গোছানো, পুরোনো জিনিস ফেলে দেওয়া এবং দরজা-জানালা পরিষ্কার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. প্রদীপ জ্বালানো
অমাবস্যার রাতে প্রদীপ জ্বালানো শুধু প্রথা নয়, এটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলে। বাড়ির প্রতিটি কোণ, ছাদ, আঙিনা এবং প্রবেশপথে তেলের প্রদীপ রাখলে অশুভ শক্তি দূর হয় এবং ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ বাড়ে। বিশেষ করে ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রদীপ রাখলে ভাগ্য উজ্জ্বল হয়।
৩. লক্ষ্মী গণেশ পূজা
দীপাবলির প্রধান আকর্ষণ লক্ষ্মী পূজা। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে গণেশ ও লক্ষ্মীকে একসঙ্গে পূজা করলে ধনসম্পদ, জ্ঞান ও সমৃদ্ধি লাভ হয়। পূজার সময় লাল কাপড়, ধূপ, প্রদীপ, কমল ফুল, চিনি, মিষ্টি ও পাঁচটি ফল নিবেদন করলে পূজা সম্পূর্ণ হয়।
৪. কালী পূজা
ভারতের পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বহু মানুষ দীপাবলির রাতে কালী পূজা করেন। দেবী কালী শক্তি ও রক্ষার প্রতীক। এই পূজা করলে জীবনের বিপদ দূর হয় এবং মনের ভয় কেটে যায়।
৫. দান ও সেবা
দীপাবলির দিনে অভাবী মানুষকে কিছু দান করলে তার ফল অনেকগুণে ফিরে আসে। পুরোনো জামাকাপড়, খাবার বা অর্থ দিয়ে সাহায্য করলে মনে শান্তি আসে। ধর্মশাস্ত্রে বলা আছে, দান করলে পাপ কমে এবং জীবনে অমঙ্গল দূর হয়।
৬. নতুন জিনিস কেনা
দীপাবলি করলে মঙ্গল – ঘরে আসবে শুভ শক্তি
এই সময়ে নতুন জিনিস কেনাকে শুভ মনে করা হয়। বিশেষ করে সোনা, রূপা বা ধাতব জিনিস কিনলে ঘরে সম্পদের স্থায়ী বৃদ্ধি হয়। অনেকে নতুন কাপড় বা বাসনও কেনেন। এটি নতুন সূচনার প্রতীক।
৭. মিষ্টি ও আতিথেয়তা
দীপাবলির দিনে অতিথিকে মিষ্টি খাওয়ানো বা প্রতিবেশীর সঙ্গে মিষ্টি ভাগ করে খাওয়ার প্রথা আছে। এতে সম্পর্ক মজবুত হয় এবং সামাজিক শান্তি বজায় থাকে।
কিছু বিশেষ টোটকা যেগুলি করলে সৌভাগ্য আসবে
- প্রবেশপথে রংগোলি আঁকা – বাড়ির দোরগোড়ায় রংগোলি বা আলপনা আঁকলে দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ মেলে।
- দরজায় তোরণ ঝোলানো – আমপাতা ও ফুল দিয়ে বানানো তোরণ বাড়িতে শুভ শক্তি ডাকে।
- লবঙ্গ ও ঘি মিশিয়ে প্রদীপ জ্বালানো – এই প্রদীপ জ্বালালে ঘরে ইতিবাচক শক্তি বাড়ে।
- ধান, দুধ ও চিনি মিশিয়ে খাওয়া – বিশ্বাস করা হয়, এটি শরীর ও মনকে পবিত্র করে।
- অর্থের থালা পূজা – টাকাপয়সা ও গয়না একটি থালায় রেখে প্রদীপ জ্বালালে অর্থ বৃদ্ধি হয়।
দীপাবলির আনন্দঘন পরিবেশ
শুধু পূজা নয়, দীপাবলির আনন্দঘন পরিবেশ মানুষকে একত্র করে। শহর-গ্রাম সব জায়গায় আলোয় সাজানো হয়। বাজারে ভিড়, রঙিন আলো, বাজি, নতুন জামাকাপড়—সবকিছু মিলিয়ে দীপাবলি একটি পারিবারিক ও সামাজিক উৎসব। ছোট থেকে বড় সবার মনে আনন্দ জাগে।
আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
অন্ধকার মানেই অজ্ঞানতা ও দুঃখ। আলো মানেই জ্ঞান, শান্তি ও আনন্দ। দীপাবলির প্রতিটি প্রদীপ আমাদের শেখায়—যতই অন্ধকার আসুক, একটি ছোট আলো তাকে জয় করতে পারে। তাই এই উৎসব শুধু পার্থিব সুখ নয়, মনের শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে।
উপসংহার
দীপাবলির দিনে এই নিয়মগুলি মেনে চললে ঘরে আসবে শান্তি, সম্পদ ও সুখ। জীবনে যত সমস্যা থাকুক না কেন, এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা নতুন করে শুরু করার সুযোগ পাই। আলোর পথে চলার সংকল্প নিলেই সত্যিই মঙ্গল ঘটে।
তাই মনে রাখুন—দীপাবলি শুধু উৎসব নয়, এটি জীবনের অশুভ দূর করে শুভ শক্তিকে আহ্বান করার শ্রেষ্ঠ দিন।
