দীপাবলি 2025 – আলোর উৎসব ইতিহাস তাৎপর্য ও পালনের নিয়ম

ভূমিকা
আমাদের দেশে যত উৎসব আছে, তার মধ্যে দীপাবলি এক বিশেষ আনন্দের সময়। এই উৎসবকে আমরা “আলোর উৎসব” নামেও চিনি। প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসের সংযোগে, অমাবস্যার রাতে, সারা ভারত জুড়ে দীপাবলি পালিত হয়। এই দিন ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলে, আলো ঝলমল করে চারদিক, বাজি-আতশবাজির শব্দে আকাশ মুখরিত হয়, আর মানুষের মনে আনন্দের রং ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দীপাবলির উৎসব শুধু আনন্দ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক নানা তাৎপর্য।
এই লেখায় আমরা সহজ বাংলায় আলোচনা করব দীপাবলির ইতিহাস, তাৎপর্য, আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক প্রভাব এবং আজকের দিনে এই উৎসব কীভাবে মানুষের জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে।
দীপাবলির উৎপত্তি ও ইতিহাস
দীপাবলি 2025 – আলোর উৎসব ইতিহাস তাৎপর্য ও পালনের নিয়ম
দীপাবলির কাহিনি অনেক প্রাচীন। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে নানা উল্লেখ পাওয়া যায়। সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি হলো—অযোধ্যার রাজপুত্র রামচন্দ্র যখন রাবণকে বধ করে লঙ্কা থেকে ফিরে আসেন, তখন অযোধ্যাবাসীরা আনন্দে ঘর ঘর প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই থেকেই দীপাবলি প্রদীপ জ্বালিয়ে পালনের প্রথা শুরু হয়।
আবার, অন্য এক কাহিনিতে বলা হয় এই দিনেই সমুদ্র মন্থনের ফলে লক্ষ্মী দেবীর আবির্ভাব ঘটে। তাই এই দিনে লক্ষ্মী পূজা করা হয়। ব্যবসায়ীদের নতুন হিসাববই খোলা, ধনসম্পদের পূজা করা—সবই এই বিশ্বাস থেকেই শুরু।
উত্তর ভারতে দীপাবলি রামের আগমনের স্মৃতি বহন করে, দক্ষিণ ভারতে এই দিনটি নারকাসুর বধের দিন হিসাবে পালিত হয়, আবার পশ্চিম ভারতে লক্ষ্মী দেবীর আবির্ভাবকে কেন্দ্র করেই উৎসবের গুরুত্ব বেড়েছে।
দীপাবলির দিনগুলি
দীপাবলি সাধারণত পাঁচ দিন ধরে পালিত হয়। প্রতিটি দিনের আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
১. ধনতেরাস – এই দিন ধনত্রয়োদশী নামে পরিচিত। এদিন নতুন বাসন, সোনা-রূপা বা কোনও মূল্যবান জিনিস কেনার রীতি আছে। বিশ্বাস করা হয় এতে বাড়িতে সমৃদ্ধি আসে।
২. নরক চতুর্দশী – দক্ষিণ ভারতে বিশেষভাবে পালিত হয়। এই দিনে নারকাসুর নামক অসুরের বধ হয়েছিল বলে কথিত আছে।
৩. দীপাবলি (অমাবস্যা) – সবচেয়ে বড় দিন। এদিন ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানো হয়, লক্ষ্মী পূজা হয়, পরিবারে আনন্দের আবহ তৈরি হয়।
৪. গোবর্ধন পূজা – উত্তর ভারতে পালিত হয়। কৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বত উত্তোলনের স্মরণে এটি পালিত হয়।
৫. ভাই দুজ – ভাই-বোনের ভালোবাসার দিন। বোনেরা ভাইদের দীর্ঘায়ু কামনা করে পূজা করে।
দীপাবলির আচার-অনুষ্ঠান
দীপাবলির প্রধান আচার হলো প্রদীপ জ্বালানো। আলো অন্ধকার দূর করে, তাই প্রদীপ জ্বালানো মানে অশুভ শক্তিকে দূর করে শুভ শক্তিকে আহ্বান জানানো।
- লক্ষ্মী পূজা – অমাবস্যার রাতে ঘর পরিষ্কার করে, আলপনা দিয়ে, প্রদীপ ও আলো সাজিয়ে লক্ষ্মী দেবীর পূজা করা হয়।
- ঘরোয়া আনন্দ – পরিবার একসঙ্গে বসে মিষ্টি খাওয়া, উপহার বিনিময়, আলোর সাজ দেখা—এসবই আনন্দ বাড়ায়।
- আতশবাজি – দীপাবলির অন্যতম আকর্ষণ আতশবাজি। তবে আজকাল শব্দদূষণ ও দূষণের কারণে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে উৎসব পালনের দিকে মানুষ ঝুঁকছে।
সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
দীপাবলি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। অন্ধকার মানেই দুঃখ, ভয়, অশুভ—আর আলো মানেই আনন্দ, সাহস ও শুভ শক্তি। দীপাবলি শেখায়—যতই অন্ধকার আসুক, আলো সবসময় অন্ধকার দূর করতে পারে।
সমাজের দিক থেকেও এই উৎসব মানুষের মধ্যে মিলন ঘটায়। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই মিলেমিশে আনন্দ করে। একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়। উপহার দেওয়া, মিষ্টি বিলানো, আলোর সাজসজ্জা দেখা—এসব এক সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে।
আধুনিক যুগে দীপাবলি
আজকের দিনে দীপাবলি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এক বিশাল সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শহরের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, শপিং মল আলোয় ভরে ওঠে। অনেকে এই সময়ে নতুন জামাকাপড় কেনে, বাড়ি সাজায়। ব্যবসায়ীদের জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মরশুম।
তবে আধুনিক যুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরিবেশ রক্ষা। আগে দীপাবলিতে প্রচুর বাজি পোড়ানো হতো। কিন্তু এখন পরিবেশ দূষণ, শব্দদূষণের কারণে অনেকেই বাজি ফাটানো এড়িয়ে চলে। পরিবর্তে প্রদীপ, ফানুস, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার মাধ্যমে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা হয়।
শিশু ও পরিবারের আনন্দ
শিশুদের কাছে দীপাবলি এক আনন্দময় উৎসব। নতুন পোশাক, মিষ্টি, আলো—সবই তাদের উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেয়। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে প্রদীপ জ্বালায়, ফুলঝুরি হাতে খেলে। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খাওয়া, ছবি তোলা—এসবই স্মৃতির ঝাঁপি ভরে দেয়।
উৎসবের শিক্ষণীয় দিক
দীপাবলি আমাদের শেখায়—
- অশুভ শক্তির বিনাশ হয়েই থাকে। রাম-রাবণের কাহিনি কিংবা নারকাসুর বধ—সবকিছুতেই এই শিক্ষা আছে।
- আলো মানেই আশা। জীবনে যত অন্ধকার আসুক, ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে আলোকিত করে।
- সম্মিলিত আনন্দই আসল আনন্দ। একা নয়, সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই উৎসবের আসল তাৎপর্য।
FAQ
প্রশ্ন ১: দীপাবলি কবে পালিত হয়?
উত্তর: দীপাবলি সাধারণত কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে পালিত হয়। ২০২৫ সালে এটি পালিত হবে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে।
প্রশ্ন ২: দীপাবলি কেন “আলোর উৎসব” বলা হয়?
উত্তর: কারণ এই দিনে ঘরঘর প্রদীপ জ্বালানো হয়, আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করা হয়, যা শুভ শক্তির প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: দীপাবলিতে কী কী পূজা হয়?
উত্তর: মূলত লক্ষ্মী পূজা, গণেশ পূজা এবং অনেক স্থানে কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন ৪: দীপাবলি কতদিন ধরে চলে?
উত্তর: দীপাবলি পাঁচ দিন ধরে পালিত হয়—ধনতেরাস, নরক চতুর্দশী, দীপাবলি (অমাবস্যা), গোবর্ধন পূজা ও ভাই দুজ।
প্রশ্ন ৫: পরিবেশবান্ধব দীপাবলি কীভাবে পালন করা যায়?
উত্তর: আতশবাজি কম ব্যবহার করে, মাটির প্রদীপ ব্যবহার করে, প্লাস্টিক এড়িয়ে এবং গাছপালা রোপণ করে পরিবেশবান্ধব দীপাবলি পালন করা যায়।
উপসংহার
দীপাবলি আমাদের জীবনের অন্যতম সুন্দর উৎসব। আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করার প্রতীকী এই উৎসব কেবল ধর্মীয় নয়, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও অনেক গুরুত্ব বহন করে। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলে শুধু অন্ধকার ঘর আলোকিত করে না, মানুষের মনকেও আশা ও আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
আজকের দিনে পরিবেশ সচেতনতার মধ্যে থেকেও আমরা দীপাবলি আনন্দের সঙ্গে পালন করতে পারি। পরিবেশবান্ধব প্রদীপ, সীমিত আতশবাজি, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য—এসব করলে দীপাবলি আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
এই আলোর উৎসব আমাদের শেখাক—অন্ধকার যতই প্রবল হোক না কেন, আলোর জয় হবেই।
