দুর্গাপূজার শেষ অধ্যায় – দশমী

দুর্গাপূজার শেষ অধ্যায় – দশমী

Spread the love

দুর্গাপূজার শেষ অধ্যায় – দশমী

দুর্গাপূজার শেষ অধ্যায় – দশমী

বাংলার ঘরে ঘরে যেমন দশমী মানে ‘সিঁদুর খেলা’ আর মায়ের বিদায়, তেমনি বেলুড় মঠে এই দিনটির রয়েছে ভক্তিময় আবহ। এখানে মাকে শুধু বিদায় দেওয়া হয় না, বরং তাঁকে জানানো হয় কৃতজ্ঞতা—সারা বছরের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য।

সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে মঠের প্রাঙ্গণে। মায়ের সামনে ভক্তরা দাঁড়িয়ে প্রণাম করেন, কেউ নীরবে প্রার্থনা করেন, কেউ আবার চোখের জলে জানান নিজের মনের কথা।

সিঁদুর খেলার আয়োজন

দশমীর অন্যতম বড় আকর্ষণ বেলুড় মঠে সিঁদুর খেলা। সকাল থেকেই বিবাহিত নারীরা শাড়ি পরে, হাতে সিঁদুর নিয়ে ভিড় জমান। প্রথমে মায়ের কপালে সিঁদুর দেওয়া হয়। তারপর ভক্তরা একে অপরকে সিঁদুর দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এই দৃশ্য এক অন্যরকম আবেগ তৈরি করে—যেখানে রঙিন সিঁদুর লাল রঙে ভরে তোলে মায়ের মণ্ডপ। নারীরা মনে করেন এই সিঁদুর খেলা শুধু আনন্দের নয়, বরং পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করার একটি উপায়।

মায়ের বিসর্জন – গঙ্গার বুকে বিদায়

দশমীর আসল মুহূর্ত আসে বিকেলের দিকে। গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় মা দুর্গাকে। তখন পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে “বলো দুর্গা মাই কি জয়!” ধ্বনিতে। হাজারো মানুষ একসঙ্গে এই ধ্বনি তুললে পুরো বেলুড় মঠ কেঁপে ওঠে ভক্তির আবেগে।

মূর্তিকে গঙ্গায় নামানো হয় ভক্তিগীতি, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে। সেই মুহূর্তে অনেকের চোখে জল আসে, কেউ আবার হাত জোড় করে মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন—“আবার এসো মা, আগামী বছর।”

মায়ের বিদায় – কিন্তু প্রতিশ্রুতি রয়ে যায়

বেলুড় মঠে মা দুর্গার বিদায় মানে শেষ নয়, বরং নতুন সূচনা। মঠের সন্ন্যাসীরা বলেন, “দেবী কেবল বিদায় নেন না, তিনি আমাদের অন্তরে থাকেন। তাঁর শক্তি, তাঁর আশীর্বাদ সারাবছর আমাদের সঙ্গে থাকে।”

এই বিশ্বাস ভক্তদের মনে আশা জাগায়। বিদায়ের কষ্ট থাকলেও, মনে থাকে প্রতিশ্রুতি—আসছে বছর আবার হবে।”

ভক্তদের অনুভূতি

দশমীর দিন বেলুড় মঠে আসা মানুষদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন আবেগ কাজ করে।

  • কারো কাছে এটি ভক্তির দিন।
  • কারো কাছে এটি আনন্দের সঙ্গে দুঃখ মেশানো মুহূর্ত।
  • আবার কারো কাছে এটি বছরের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।

মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের জীবনযাত্রার সব কষ্ট ভুলে যান। বিদায়ের সময় মনে হয় মা যেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন—“আমি তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না, তোমাদের সঙ্গে আছি।”

বেলুড় মঠের বিশেষত্ব

দুর্গাপূজার শেষ অধ্যায় – দশমী

অন্যান্য জায়গার তুলনায় বেলুড় মঠের দশমীর আবহ আলাদা। কারণ এখানে শুধু উৎসব নয়, আধ্যাত্মিক সাধনার মেলবন্ধন ঘটে। সন্ন্যাসীরা মন্ত্রোচ্চারণ, হোমযজ্ঞ ও পূজার্চনা করেন ভক্তদের মঙ্গল কামনায়।

এছাড়া গঙ্গার ধারে বিসর্জন দেওয়ার সময় ভক্তরা মনে করেন মা যেন প্রকৃতির সঙ্গেই মিলিয়ে গেলেন। গঙ্গার ঢেউ, সন্ধ্যার আরতি আর শঙ্খধ্বনি মিলিয়ে সেই মুহূর্ত হয়ে ওঠে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা।

দশমীর শিক্ষণীয় দিক

দশমী শুধু বিদায় নয়, এটি জীবনেরও শিক্ষা দেয়।

  • যেমন মা আসেন, তেমনি তিনি বিদায় নেন—এটাই জীবনের চক্র।
  • আনন্দের সঙ্গে কষ্ট মিলিয়ে থাকে জীবন।
  • বিদায় মানেই শেষ নয়, বরং নতুন করে শুরুর প্রত্যাশা।

উপসংহার

বেলুড় মঠের দশমীতে দুর্গা মায়ের বিদায় বেলা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এখানে মানুষ শুধু পূজা দেখতে আসে না, বরং হৃদয়ের গভীরে শান্তি ও শক্তি খুঁজে পায়। মায়ের বিসর্জন মানে তাঁর প্রস্থান নয়, বরং মানুষের অন্তরে তাঁর স্থায়ী অবস্থান।

প্রতি বছর যেমন মা আসেন, তেমনই ভক্তরা আশায় থাকেন—আসছে বছর আবার হবে।

FAQ (প্রশ্নোত্তর)

১. বেলুড় মঠে দশমীর সিঁদুর খেলার সময় কখন হয়?
সাধারণত সকালে পূজা শেষে সিঁদুর খেলা হয়।

২. দশমীর বিসর্জন কোথায় হয়?
বেলুড় মঠে মা দুর্গাকে গঙ্গার ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়।

৩. সাধারণ মানুষ কি বেলুড় মঠে দশমীর পূজায় অংশ নিতে পারেন?
হ্যাঁ, প্রত্যেক বছর হাজার হাজার ভক্ত এখানে উপস্থিত হন।

৪. বেলুড় মঠে দশমীর বিশেষত্ব কী?
এখানে উৎসবের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার মিলন ঘটে। বিসর্জনের আবহ অনেক বেশি ভক্তিপূর্ণ ও শান্ত।

৫. মায়ের বিসর্জন মানেই কি শেষ?
না, ভক্তরা বিশ্বাস করেন মা তাঁদের অন্তরে থাকেন এবং আবার ফিরে আসেন।

আরও পড়ুন

👉 অষ্টমীর পর নবমী 2025: দুর্গাপূজার শেষ মহোৎসবের সূচনা আজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *