আলোকসজ্জায় ঝলমল শহর: দীপাবলির আনন্দঘন পরিবেশ

ভূমিকা
দীপাবলি বা দীপোৎসব কেবল একটি উৎসব নয়, এটি আনন্দ, আলো আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যায় এই উৎসব ভারতবর্ষ সহ সারা বিশ্বে বসবাসরত হিন্দু সমাজে উদযাপিত হয়। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর বিজয়, অসুরের বিরুদ্ধে সুরের জয়, আর মন থেকে নেতিবাচকতা দূরে সরিয়ে ইতিবাচকতার আহ্বান—এই সব কিছুর প্রতীক হল দীপাবলি।
আজকের দিনে দীপাবলি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পারিবারিক আনন্দেরও অংশ হয়ে উঠেছে। এই দিনে শহর জুড়ে আলোকসজ্জার যে ঝলকানি দেখা যায়, তা যেন প্রত্যেকের মনে নতুন আশা, নতুন আনন্দের আলো জ্বালিয়ে দেয়।
দীপাবলির ইতিহাস ও তাৎপর্য
আলোকসজ্জায় ঝলমল শহর: দীপাবলির আনন্দঘন পরিবেশ
দীপাবলির শেকড় বহু পুরনো পৌরাণিক কাহিনিতে প্রোথিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনি হল—অযোধ্যার রাজপুত্র শ্রী রামের চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে রাবণকে পরাজিত করে ঘরে ফেরা। অযোধ্যাবাসীরা অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজা রামচন্দ্রকে স্বাগত জানান। সেই থেকেই আলো জ্বালানোর এই রীতি শুরু হয়।
আরেকটি কাহিনি অনুযায়ী, এই দিনেই শ্রীকৃষ্ণ অসুর নরকাসুরকে বধ করেছিলেন। কেউ আবার বলেন, সমুদ্র মন্থনের দিনে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাব হয়েছিল এই দিনে। তাই দীপাবলি মানেই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা ও সম্পদ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের আহ্বান।
শহরে আলোকসজ্জার রূপ
দীপাবলি এলেই শহরের চেহারা একেবারে পাল্টে যায়। অন্ধকার রাত যেন পরিণত হয় আলোকের উৎসবে। প্রতিটি গলিপথ, রাস্তা, বাজার, বাড়ি ও দালানকোঠা আলোয় সেজে ওঠে।
- বাড়িঘরে আলোর সাজ
প্রতিটি বাড়ি রঙিন আলোয় সজ্জিত হয়। ছাদ থেকে ঝোলানো ঝাড়লাইট, বারান্দায় টিমটিমে ফেয়ারি লাইট, দরজায় রঙোলি আর প্রদীপ—সব মিলিয়ে এক মুগ্ধকর পরিবেশ। - বাজার ও দোকানপাট
দোকানদাররা এই সময় বিশেষভাবে দোকান সাজিয়ে তোলেন। নানান রঙের আলো, থিমভিত্তিক সজ্জা, আর অফারের পোস্টার যেন ক্রেতাদের আকর্ষণ করে টানে। - মন্দির ও ধর্মীয় স্থানে আলো
মন্দিরগুলোতে বিশেষ আলোকসজ্জা হয়। ভক্তরা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন এবং দেবী লক্ষ্মী-গণেশের পূজা করেন। - শহরের রাস্তাঘাটে সাজ
শহরের প্রধান সড়কগুলো রঙিন আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে। কোথাও দেখা যায় জাতীয় পতাকার রঙে সাজানো লাইটিং, কোথাও আবার ধর্মীয় কাহিনি ফুটে ওঠে আলোর মাধ্যমে।
দীপাবলির আনন্দঘন পরিবেশ
দীপাবলি কেবল আলো নয়, এটি আনন্দ, মিলন আর উল্লাসের উৎসব।
- পারিবারিক আনন্দ: পরিবারের সবাই একত্রে মিলিত হয়, নতুন জামাকাপড় পরে, মিষ্টি ভাগ করে খায়।
- বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন: এই দিনে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি গিয়ে উপহার দেওয়ার রীতি আছে। এতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
- শিশুদের উল্লাস: শিশুরা আতশবাজি, ফানুস উড়িয়ে আনন্দে মেতে ওঠে।
- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: অনেক জায়গায় দীপাবলি উপলক্ষে মেলা বসে, নাটক, সংগীত, নৃত্যানুষ্ঠান হয়।
আতশবাজির ঝলকানি
দীপাবলির আরেকটি আকর্ষণ আতশবাজি। রাতের আকাশ রঙিন আলোর ঝলকানিতে ভরে ওঠে। তবে পরিবেশ দূষণের কারণে আজকাল অনেকেই পরিবেশবান্ধব উপায়ে দীপাবলি উদযাপন করছেন। অনেকে কেবল প্রদীপ, মোমবাতি আর আলো দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন পরিবেশ।
দীপাবলি ও সামাজিক বন্ধন
দীপাবলি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়, মিষ্টি খাওয়ায়। এটি জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একত্রিত করে।
দীপাবলি ও অর্থনীতি
এই উৎসব ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। নতুন জামাকাপড়, সোনা-চাঁদি কেনা, উপহার, মিষ্টি—সব মিলিয়ে বাজারে একপ্রকার বাণিজ্যিক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা দীপাবলির সময়কে বছরের সেরা ব্যবসার সময় বলে মনে করেন।
আধুনিক দীপাবলি
আজকের যুগে দীপাবলি পালনের ধরন কিছুটা বদলেছে। ডিজিটাল আমন্ত্রণপত্র, অনলাইনে উপহার পাঠানো, এলইডি আলো দিয়ে সজ্জা—সবই আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে এসেছে। তবে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার মূল ভাবনা আজও অটুট রয়েছে।
দীপাবলি ও ইতিবাচকতা
দীপাবলি মানেই আলো, আর আলো মানেই ইতিবাচকতা। এই দিনে মানুষ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—অন্ধকার দূর করে জীবনে নতুন আলো আনবে। নেতিবাচকতা ভুলে, ভালোবাসা, দয়া ও সৌহার্দ্য ছড়িয়ে দেবে।
FAQ (প্রশ্নোত্তর)
প্রশ্ন ১: দীপাবলি কবে উদযাপিত হয়?
উত্তর: দীপাবলি প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে উদযাপিত হয়। ২০২৫ সালে দীপাবলি পালিত হবে অক্টোবর মাসে।
প্রশ্ন ২: দীপাবলির ইতিহাস কী?
উত্তর: দীপাবলি শ্রী রামের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিতে পালিত হয়। এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণের নরকাসুর বধ এবং দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের সাথেও দীপাবলির সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশ্ন ৩: দীপাবলিতে কেন আলোকসজ্জা করা হয়?
উত্তর: অন্ধকার দূর করে আলো দিয়ে ইতিবাচকতা ও আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক হিসেবে প্রদীপ ও আলোকসজ্জা করা হয়।
প্রশ্ন ৪: দীপাবলির প্রধান আকর্ষণ কী কী?
উত্তর: আলোকসজ্জা, আতশবাজি, রঙোলি, দেবী লক্ষ্মী-গণেশের পূজা, মিষ্টি বিতরণ ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা দীপাবলির প্রধান আকর্ষণ।
প্রশ্ন ৫: দীপাবলি কি কেবল হিন্দুদের উৎসব?
উত্তর: দীপাবলি মূলত হিন্দুদের উৎসব হলেও আজ এটি সামাজিক মিলনের উৎসব হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই উৎসব উপভোগ করেন।
উপসংহার
দীপাবলির আলোকসজ্জায় ঝলমল শহর যেন এক অপূর্ব স্বপ্নরাজ্য। চারদিকে আলো, আনন্দ, উৎসব আর মিলনের আবহ। দীপাবলি কেবল একটি উৎসব নয়, এটি জীবনকে সুন্দর করে তোলার এক শিক্ষা। অন্ধকার যতই ঘন হোক, একটুকরো প্রদীপের আলোই তাকে জয় করতে পারে। আর সেই আলোর বার্তা নিয়েই দীপাবলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্য, শুভ আর ইতিবাচকতার পথেই এগিয়ে চলতে হবে।
