ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

Spread the love

ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

শরৎকালের স্নিগ্ধ বাতাসে যখন পিতৃপুরুষের স্মৃতি ও দেবী দুর্গার আগমনী গান ধ্বনিত হয়, তখনই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় এক বিশেষ উৎসবের আবহ। আশ্বিনী পূর্ণিমার দিন পালিত হয় লক্ষ্মী পূজা—ধন, ঐশ্বর্য, শান্তি আর সুখ-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা। দুর্গাপূজার সমাপ্তির পর এই পূজা বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এদিন যেন মা দুর্গার বিদায়ের বিষাদকে পূর্ণতার আনন্দে রূপান্তরিত করে মা লক্ষ্মীর আবির্ভাব। তাই একে বলা হয় ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী

লক্ষ্মী পূজার তাৎপর্য

লক্ষ্মী দেবী হিন্দু শাস্ত্র মতে ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গৃহস্থ জীবনে সমৃদ্ধি, শান্তি ও সুখ বজায় রাখতে লক্ষ্মী পূজা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। বিশেষত আশ্বিনী পূর্ণিমার এই দিনটি শাস্ত্রসম্মতভাবে অত্যন্ত শুভ। বাঙালি পরিবারে বিশ্বাস, এদিন ভক্তিভরে পূজা করলে মা লক্ষ্মী সংসারে অন্ন, ধন এবং সুখের অবারিত আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।

দুর্গাপূজার পর লক্ষ্মী পূজা

দুর্গাপূজা শেষ হতেই বাঙালির মন ভরে ওঠে শূন্যতায়। প্রতিটি পরিবার তখন এক নতুন আলো, এক নতুন আনন্দের প্রত্যাশায় থাকে। সেই প্রত্যাশার পূরণ ঘটায় লক্ষ্মী পূজা। এ যেন মা দুর্গার বিদায়ের পর মেয়ের ঘরে ঘরে শাশ্বত কন্যা লক্ষ্মীর আগমন। তাই গ্রামের বাড়ি হোক বা শহরের ফ্ল্যাট, সর্বত্রই এদিন শোনা যায় শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর প্রদীপ জ্বালানোর ঝলকানি।

পূজার প্রস্তুতি

লক্ষ্মী পূজার আগে ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়। কারণ বিশ্বাস, অগোছালো, নোংরা ঘরে মা লক্ষ্মী প্রবেশ করেন না। গৃহিণীরা মেঝেতে আলপনা আঁকেন, ধানের আঁটি, চাল, দুধ, ফল, নাড়ু, সন্দেশ, মিষ্টি দিয়ে মা’কে ভোগ নিবেদন করা হয়। গ্রামে গ্রামে আজও মাটির তৈরি লক্ষ্মী প্রতিমা বা ছবি পূজিত হয়। শহরে কেউ কেউ রুপোর বা পিতলের প্রতিমাও ব্যবহার করেন।

আলপনা ও ধানের শস্য

লক্ষ্মী পূজার অন্যতম আকর্ষণ আলপনা। সাদা গুঁড়ো দিয়ে মেঝেতে অঙ্কিত হয় ধান, পদ্মফুল, শঙ্খ, শঙ্খচক্রের নকশা। এগুলো মা লক্ষ্মীর প্রতীক। ধানের আঁটি দিয়ে সাজানো হয় পূজামণ্ডপ। বিশ্বাস, নতুন শস্যের সাথে মা লক্ষ্মীর আগমন ঘটে। তাই বাংলার কৃষিজীবী সমাজে এই পূজার বিশেষ তাৎপর্য আছে।

পূজার আচার-বিধি

  1. সন্ধ্যাবেলা পূজা শুরু হয় – প্রদীপ জ্বালিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে দেবীর আহ্বান করা হয়।
  2. মন্ত্রোচ্চারণ ও আরতি – পুরোহিত বা গৃহস্থ নিজেই মন্ত্রপাঠ করে পূজা করেন।
  3. ভোগ নিবেদন – নারকেলের নাড়ু, মোয়া, ক্ষীর, ফলমূল, মিষ্টি প্রভৃতি।
  4. অঞ্জলি প্রদান – ধান, দুধ, জল ও ফুল দিয়ে দেবীকে অঞ্জলি দেওয়া হয়।
  5. আরতি ও প্রসাদ বিতরণ – পরিবারের সকলে মিলে প্রসাদ গ্রহণ করে শুভ সমাপন।

গ্রামের লক্ষ্মী পূজা

গ্রামীণ বাংলায় লক্ষ্মী পূজা একেবারে সামাজিক উৎসবের রূপ নেয়। পাড়ার মাঠে বা কারও উঠোনে বড় করে প্রতিমা স্থাপন হয়, ঢাক-ঢোলের তালে পূজা হয়, রাতভর চলে কীর্তন। গ্রামের মহিলারা একত্রে ভক্তিগীতি গেয়ে পরিবেশকে করে তোলেন মঙ্গলময়। শিশুরা প্রদীপ হাতে দৌড়াদৌড়ি করে আনন্দ খুঁজে পায়।

শহরের পূজার আবহ

শহুরে জীবনে যদিও জাঁকজমক কিছুটা কম, তবে ভক্তি ও আন্তরিকতায় কোনও খামতি নেই। পরিবারে পরিবারে ছোট্ট করে প্রতিমা সাজানো হয়, বাচ্চারা ফুল দিয়ে সাজায় ঘর। অনেকে আবার ফ্ল্যাটের ছাদে প্রদীপ জ্বালিয়ে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেন।

লক্ষ্মী পূজা ও পারিবারিক বন্ধন

এই পূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি পারিবারিক মিলনেরও উৎসব। একসাথে বসে আলপনা আঁকা, ফুল সাজানো, মিষ্টি বানানো—সব মিলিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। মা-বাবা সন্তানদের শেখান পূজার তাৎপর্য ও সংস্কৃতির শিকড়।

পূজার বিশেষ ভোগ

লক্ষ্মী পূজার ভোগে থাকে—

  • নারকেলের নাড়ু
  • খেজুর গুড়ের মোয়া
  • মুড়ির মোয়া
  • ক্ষীর বা দুধপাক
  • বিভিন্ন ফল
  • সন্দেশ ও রসগোল্লা

বিশ্বাস ও কাহিনি

শাস্ত্রে আছে, যিনি নিষ্ঠাভরে পূজা করেন, তাঁর ঘরে চিরস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি নেমে আসে। আবার বলা হয়, এই পূর্ণিমার রাতেই মা লক্ষ্মী ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান এবং যেখানে ভক্তি ও পরিচ্ছন্নতা পান, সেখানেই বসবাস করেন।

আলোকসজ্জা ও আনন্দ

এদিন বহু মানুষ প্রদীপ জ্বালিয়ে, আলো দিয়ে ঘর সাজান। মনে করা হয়, অন্ধকার দূর করে আলোর আগমনে দেবী প্রবেশ করেন। তাই আজকের দিনে গ্রাম হোক বা শহর, প্রত্যেক ঘরেই আলো ঝলমল করে ওঠে।

সামাজিক গুরুত্ব

ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

লক্ষ্মী পূজা শুধু ব্যক্তিগত পূজা নয়, এটি সামাজিক মিলনের প্রতীকও। পাড়ায় পাড়ায় সমবেত প্রার্থনা, ভক্তিগান, আলপনা প্রতিযোগিতা, এমনকি আজকাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়।

বর্তমান সময়ে লক্ষ্মী পূজা

যুগের পরিবর্তনে পূজার ধরনেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগেকার মতো বড়সড় প্রতিমা না হলেও ঘরোয়া পূজা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলপনা, ভোগ—সবকিছু আজও সমান গুরুত্ব নিয়ে পালিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও আজকাল পূজার ছবি, ভিডিও শেয়ার করে মানুষ আনন্দ ভাগ করে নেন।

FAQ 

প্রশ্ন ১: আশ্বিনী পূর্ণিমায় কেন লক্ষ্মী পূজা করা হয়?
উত্তর: এই দিনে মা লক্ষ্মীর পূজা করলে ঘরে শান্তি, ধন-ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।

প্রশ্ন ২: লক্ষ্মী পূজার প্রধান ভোগ কী কী?
উত্তর: নারকেলের নাড়ু, খেজুর গুড়ের মোয়া, মুড়ির মোয়া, ক্ষীর, ফলমূল ও বিভিন্ন মিষ্টি।

প্রশ্ন ৩: লক্ষ্মী পূজার জন্য ঘর সাজানোর বিশেষত্ব কী?
উত্তর: ঘর পরিষ্কার রাখা, মেঝেতে আলপনা আঁকা এবং প্রদীপ জ্বালানো লক্ষ্মী পূজার মূল বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন ৪: লক্ষ্মী পূজা কি শুধু ঘরে হয় নাকি বাইরে আয়োজন হয়?
উত্তর: শহরে মূলত ঘরে ঘরে পূজা হয়, তবে গ্রামে অনেক সময় সামাজিকভাবে প্রতিমা স্থাপন করে পূজা করা হয়।

প্রশ্ন ৫: দুর্গাপূজার পরেই কেন লক্ষ্মী পূজা হয়?
উত্তর: দুর্গাপূজা শেষে যখন ঘরে শূন্যতা নেমে আসে, তখন লক্ষ্মী পূজা আনন্দ ও পূর্ণতার বার্তা নিয়ে আসে।

উপসংহার

আশ্বিনী পূর্ণিমার লক্ষ্মী পূজা বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্গাপূজার পর বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার এক অনন্য উপলক্ষ এটি। মা লক্ষ্মীর আগমনে প্রতিটি পরিবারে যেন নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে। ভক্তি, বিশ্বাস আর আনন্দে ভরে ওঠে প্রতিটি ঘর। তাই তো বলা হয়—

“ঘরে ঘরে দেবীর আগমনী—আশ্বিনী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা।”

আরও পড়ুন

👉 লক্ষ্মী পূজা 2025: ঘরে ঘরে ধন-সমৃদ্ধির দেবীর আরাধনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *