বেলুড় মঠে দশমী 2025 : দুর্গা মায়ের বিদায় বেলার আবেগঘেরা মুহূর্ত

শরৎকালের আকাশ, হালকা নীল রঙে মোড়া, বাতাসে কাশফুলের দোলা—এই সময়ে বাংলার প্রতিটি মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন দুর্গাপূজার জন্য। আর সেই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন, অর্থাৎ বিজয়া দশমী, বাঙালির হৃদয়ে বেদনার সঙ্গে মিশে থাকে আনন্দের আবেশ। বেলুড় মঠে এই দিনটির আবহ একেবারেই আলাদা। ২০২৫ সালের দশমীতেও সেই একই আবেগঘেরা পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে ভক্তরা একদিকে দেবী দুর্গার বিদায় বেলায় চোখের জল ফেলবেন, অন্যদিকে ভক্তি আর আধ্যাত্মিকতার আনন্দে ভেসে যাবেন।
বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার বিশেষত্ব
বেলুড় মঠ মানেই শুধুমাত্র একটি পূজার আসর নয়, এটি হল এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত এই স্থানে দুর্গাপূজা হয় খুবই সরল ও ভক্তিমূলক পরিবেশে। ঢাকের তালে, বেলপাতার গন্ধে আর মন্ত্রোচ্চারণে মঠ প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে ভক্তির আবহে। পূজার শুরু থেকে মহাষ্টমী, মহানবমী পেরিয়ে দশমীর দিন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ আসেন দেবীকে প্রণাম করতে।
দশমীর সকাল: দেবীকে প্রণাম
দশমীর দিন সকালে পূজার্চনা শেষে দেবীকে বিশেষভাবে সিঁদুর আর অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। ভক্তরা ফুল, বেলপাতা, ফল দিয়ে দেবীকে প্রণাম করেন। সেদিন মঠ প্রাঙ্গণে ভক্তদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সকলে চেষ্টা করেন একবারের জন্য হলেও দেবীর চরণে মাথা ঠেকাতে।
সিঁদুর খেলা: আবেগের রঙে ভক্তরা
দশমীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রীতি হল সিঁদুর খেলা। বেলুড় মঠে হাজার হাজার নারী একত্রিত হয়ে দেবীর গায়ে সিঁদুর দেন এবং পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর মেখে শুভেচ্ছা জানান। এই দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব—লাল রঙে ভরে ওঠে দেবীপ্রাঙ্গণ। চোখের কোণে জল, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি—এ যেন আবেগ আর আনন্দের এক অনন্য মেলবন্ধন।
বিদায়ের মন্ত্র ও ভক্তদের অনুভূতি
দশমীর আসল মুহূর্ত হল দেবীর বিদায় বেলা। পুরোহিতরা যখন বিদায়ের মন্ত্রোচ্চারণ করেন, তখন ভক্তদের চোখ ভিজে ওঠে। মনে হয়, মায়ের চলে যাওয়া মানেই শূন্যতা। কিন্তু মঠের পরিবেশ মানুষকে বোঝায়—দেবী কোথাও যাচ্ছেন না, তিনি আছেন প্রতিটি হৃদয়ে, প্রতিটি ভক্তির মাঝে।
গঙ্গার ঘাটে বিসর্জন
বেলুড় মঠের দশমীর বিসর্জন অনুষ্ঠানের দৃশ্য সত্যিই অনন্য। গঙ্গার ঘাটে ভক্তরা ভিড় জমান দেবীর বিদায়যাত্রা দেখতে। ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনিতে, “বলো দুর্গা মা কি জয়!” ধ্বনিতে গঙ্গার বাতাস কেঁপে ওঠে। গঙ্গার জলে প্রতিফলিত হয় দেবীর প্রতিমা। ধীরে ধীরে প্রতিমা যখন বিসর্জনের জন্য জলে ভাসানো হয়, তখন চারপাশে এক গভীর নীরবতা নেমে আসে। ভক্তদের চোখে জল, কিন্তু হৃদয়ে ভরসা—মা আবার আসবেন আগামী বছরে।
দশমীর প্রণাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়
বেলুড় মঠে দশমীর আরেকটি বিশেষ রীতি হল বিজয়া প্রণাম। ভক্তরা একে অপরকে প্রণাম করে, আলিঙ্গন করে এবং বলেন—”শুভ বিজয়া”। ছোট-বড় সবাই মিষ্টি মুখ করেন, কেউ সন্দেশ, কেউ নারকেল নাড়ু, কেউ আবার ক্ষীর দান করেন। এদিন অপরিচিত মানুষও হয়ে ওঠেন আপন।
আবেগঘেরা মুহূর্ত
২০২৫ সালের দশমীতেও বেলুড় মঠের পরিবেশ ভক্তদের চোখে জল এনে দেবে। কারণ দেবীর চলে যাওয়া মানে কেবল প্রতিমার বিদায় নয়, বরং এক আবেগময় অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে একইসঙ্গে থাকে প্রত্যাশা—”আসছে বছর আবার হবে”।
ভক্তদের জন্য আধ্যাত্মিক বার্তা
বেলুড় মঠে দশমী 2025 : দুর্গা মায়ের বিদায় বেলার আবেগঘেরা মুহূর্ত
বেলুড় মঠ সবসময় শিখিয়েছে—দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ভক্তির, সংযমের, মানবতার আর ভ্রাতৃত্বের উৎসব। দশমীর দিনে ভক্তরা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন জীবনে সৎপথে চলার, অন্যকে সাহায্য করার এবং মায়ের আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করার।
উপসংহার
বেলুড় মঠে দশমী ২০২৫ শুধুই একটি উৎসব নয়, এটি এক আবেগঘেরা যাত্রা। দেবীর বিদায় মানে অস্থায়ী বিচ্ছেদ, কিন্তু আধ্যাত্মিকতার আলোয় ভক্তরা খুঁজে পান চিরন্তন সঙ্গ। ঢাকের আওয়াজ ধীরে ধীরে স্তব্ধ হলেও মানুষের মনে মায়ের ছোঁয়া থেকে যায় সারাবছর।
FAQ:
প্রশ্ন ১: বেলুড় মঠে দশমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কী?
উত্তর: সিঁদুর খেলা এবং গঙ্গার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনই বেলুড় মঠের দশমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
প্রশ্ন ২: দশমীর দিনে বেলুড় মঠে সাধারণ দর্শনার্থীরা আসতে পারেন কি?
উত্তর: হ্যাঁ, সাধারণ দর্শনার্থীরা আসতে পারেন এবং দেবীর পূজা, সিঁদুর খেলা ও বিসর্জন দেখতে পারেন।
প্রশ্ন ৩: দশমীর পরিবেশ কেন এত আবেগঘেরা হয়?
উত্তর: কারণ এদিন দেবী দুর্গার বিদায় হয়। ভক্তদের মনে শূন্যতা এলেও থেকে যায় ভরসা—মা আবার আসবেন।
প্রশ্ন ৪: বেলুড় মঠের দশমীতে কোন বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়?
উত্তর: মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও সৎপথে চলার বার্তা দেওয়া হয়, যা দুর্গাপূজার আসল মর্ম।
প্রশ্ন ৫: বেলুড় মঠের দশমী ২০২৫ কখন হবে?
উত্তর: ২০২৫ সালের বিজয়া দশমী পালিত হবে অক্টোবর মাসে, মহালয়ার পর নির্ধারিত তিথি অনুযায়ী।
