দক্ষিণবঙ্গে ঘন মেঘের চাদর – আলিপুর আবহাওয়া দফতরের নতুন সতর্কতা জারি!

দক্ষিণবঙ্গের আকাশ যেন আজ একেবারে ভারী মেঘের চাদরে ঢাকা। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা— প্রায় সব জেলাতেই সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, সঙ্গে টিপটিপ কিংবা মাঝেমধ্যেই ভারী বৃষ্টি। আলিপুর আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই নতুন সতর্কতা জারি করেছে— পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা দক্ষিণবঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল।
🌧️ দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র
গত কয়েকদিন ধরে দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছিল। বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে তৈরি হয়েছে একটি নিম্নচাপের ক্ষেত্র, যা ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। এই নিম্নচাপের প্রভাবে প্রচুর পরিমাণে জলীয়বাষ্প ঢুকছে রাজ্যের আকাশে। ফলে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় দিনভর ভারী গুমোট ভাব ও ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশ দেখা যাচ্ছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, আগামী ২ দিন দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বৃষ্টিপাত আরও বাড়বে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী জেলা— পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
☁️ কলকাতার আকাশে মেঘের দাপট
কলকাতার আকাশ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অন্ধকার। সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি। হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি চলছে বিভিন্ন এলাকায়— যেমন টালিগঞ্জ, যাদবপুর, বেহালা, শ্যামবাজার, সল্টলেক ও রাজারহাট। রাস্তায় যানবাহন ধীরে চলছে, অফিসযাত্রীদের বেশ ভোগান্তি হচ্ছে।
বিকেল গড়াতেই কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় আবারও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। আলিপুর দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি, আর সর্বনিম্ন প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকবে। আর্দ্রতার পরিমাণ ৯০ শতাংশেরও বেশি, ফলে গুমোট ভাব আরও বাড়বে।
🌩️ হাওড়া, হুগলি ও নদিয়ায় বজ্রসহ বৃষ্টি
হাওড়া ও হুগলিতেও বৃষ্টির দাপট কম নয়। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। নদিয়ার কৃষ্ণনগর ও শান্তিপুরে ইতিমধ্যেই কালবৈশাখী ধরনের ঝোড়ো হাওয়া বইছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই বজ্রসহ বৃষ্টি মূলত উত্তর বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের টানেই ঘটছে।
বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়বে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মানুষকে খোলা জায়গায় না থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
🌀 উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকায় ৩০-৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতাও বাড়বে বলে আশঙ্কা। তাই মৎস্যজীবীদের আগামী ২৪ ঘণ্টা গভীর সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
দিঘা, মন্দারমণি, শঙ্করপুর ও বকখালির হোটেল এলাকাগুলিতে পর্যটকদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রশাসন সমুদ্রের ধার ঘেঁষে সতর্কতামূলক মাইকিংও করছে।
🌦️ বৃষ্টিতে বিপাকে সাধারণ মানুষ
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে বহু জায়গায় জল জমে গেছে। দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া, যাদবপুর, টালিগঞ্জে রাস্তায় হাঁটু পর্যন্ত জল। বাস, অটো ও ট্যাক্সি চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। অফিসযাত্রীদের ভিজে অফিস পৌঁছাতে হচ্ছে।
অনেক স্কুল-কলেজে উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। তবে, বৃষ্টির ছুটিতে শিশুদের মুখে হাসি ফুটেছে। ঘরে বসে গরম চা ও খিচুড়ি-পেঁয়াজির সুবাসে শহর পেয়েছে এক অন্যরকম মেজাজ।
🌤️ উত্তরবঙ্গেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি
যদিও উত্তরবঙ্গে তেমন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, তবে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে হালকা বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোচবিহার ও মালদহে মেঘলা আকাশ ও মাঝে মাঝে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি চলবে।
আলিপুর দফতর জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
🌧️ নিম্নচাপের প্রভাব: কারণ ও বিশ্লেষণ
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই সময় বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অক্টোবরের শুরুতে মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলেও সাগরে এখনও প্রচুর আর্দ্রতা থাকে। যখন কোনও নিম্নচাপ তৈরি হয়, তখন তা প্রচুর জলীয়বাষ্প টেনে নেয় এবং বৃষ্টি নিয়ে আসে।
এই নিম্নচাপ বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থান করছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় তা পশ্চিমবঙ্গের দিকে এগোতে পারে। এর ফলে শনিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা।
🚨 আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সতর্কতা
আলিপুর দফতরের তরফে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জারি করা হয়েছে—
- বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, নদীর ধার বা উঁচু গাছের নিচে না থাকার পরামর্শ।
- উপকূলবর্তী এলাকার মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়া নিষেধ।
- বিদ্যুৎপৃষ্টের আশঙ্কায় মোবাইল বা টেলিফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
- শহরের নিম্নাঞ্চলে জল জমলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে অনুরোধ।
- প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িক বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
🌾 কৃষিতে প্রভাব
এই সময় দক্ষিণবঙ্গে ধানের শিষ বেরোনোর সময় চলছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের কৃষকেরা উদ্বিগ্ন। ধানক্ষেতে অতিরিক্ত জল জমলে চারা নষ্ট হতে পারে।
তবে, যারা আগে ধান কাটার কাজ শুরু করেছেন, তারা কিছুটা স্বস্তিতে। কৃষি দফতর কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছে এবং নিকাশির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পরামর্শ দিয়েছে।
🚗 শহরজুড়ে যানজট ও সমস্যা
কলকাতায় সকাল থেকেই বৃষ্টির কারণে যানজট দেখা দিয়েছে। পার্ক সার্কাস, রুবি, গড়িয়া মোড়, এসপ্ল্যানেড, হাওড়া ব্রিজ— সব জায়গাতেই গাড়ির ধীরগতি। ট্রাফিক পুলিশ বৃষ্টির মধ্যে অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করেছে।
মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক থাকলেও, অটোচালকরা ভাড়ার অজুহাতে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
💡 বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জনদুর্ভোগ
হাওড়া, বেহালা, সল্টলেক ও ডানকুনির বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। সিইএসসি জানিয়েছে, অধিকাংশ জায়গায় দ্রুত কাজ চলছে, তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
🌈 বৃষ্টির শেষে আশার আলো
আবহাওয়াবিদদের অনুমান, রবিবারের পর থেকে ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হবে। নিম্নচাপ দুর্বল হয়ে গেলে বৃষ্টি কমে যাবে, তবে আর্দ্রতা ও গরম ভাব কিছুটা থাকবে।
এই বৃষ্টিই প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদও বটে— গাছপালা ধুয়ে সতেজ হয়ে উঠছে, শহরজুড়ে ধুলো ও দূষণ অনেকটাই কমেছে।
📅 আগামী কয়েক দিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাস
| তারিখ | সম্ভাব্য অবস্থা | তাপমাত্রা (°C) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ৯ অক্টোবর | বজ্রসহ মাঝারি বৃষ্টি | সর্বোচ্চ ৩০, সর্বনিম্ন ২৫ | বজ্রপাতের সম্ভাবনা |
| ১০ অক্টোবর | মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি | সর্বোচ্চ ২৯, সর্বনিম্ন ২৪ | উপকূলীয় জেলাগুলিতে সতর্কতা |
| ১১ অক্টোবর | হালকা বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ | সর্বোচ্চ ৩১, সর্বনিম্ন ২৫ | বৃষ্টি কমবে |
| ১২ অক্টোবর | আংশিক মেঘলা | সর্বোচ্চ ৩২, সর্বনিম্ন ২৫ | আবহাওয়া উন্নতি হবে |
🏠 জনজীবনে প্রভাব ও প্রস্তুতি
রাজ্য প্রশাসন ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পুরসভাকে সতর্ক করেছে যাতে জলনিকাশির ব্যবস্থা ঠিক থাকে। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরও প্রস্তুত।
কলকাতা পুরসভা জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম খোলা আছে, যেকোনও নাগরিক সেখানে যোগাযোগ করতে পারেন।
নদিয়ার কৃষ্ণনগরে এবং ক্যানিংয়ে স্কুল প্রশাসন কিছু স্কুল সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
☕ শহরের মনভরা মুহূর্ত
তবে, এই বৃষ্টির দিনেও শহরের মানুষ নিজস্ব ছন্দ খুঁজে নেয়। রাস্তায় ছাতা হাতে ছুটছে মানুষ, চায়ের দোকানে ভিড়, বইয়ের দোকানে গরম কফির সুবাস, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টির ছবি।
বৃষ্টিতে ভেজা কলকাতা যেন আবারও এক প্রেমের শহর হয়ে ওঠে— রোমান্টিক, রহস্যময়, অথচ জীবন্ত।
❓ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি কেন বাড়ছে?
উত্তর: বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে একটি নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে প্রচুর জলীয়বাষ্প ঢুকছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: কলকাতা ও হাওড়ায় কতদিন বৃষ্টি চলবে?
উত্তর: আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বজ্রসহ বৃষ্টি চলতে পারে।
প্রশ্ন ৩: উপকূলবর্তী এলাকায় ঝড়ের সম্ভাবনা আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে ৩০-৪০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যেতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: এই বৃষ্টিতে কৃষিতে প্রভাব পড়বে কি?
উত্তর: অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ধানের ক্ষেতে জল জমতে পারে, যা চাষের ক্ষতি করতে পারে। তাই কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: বৃষ্টির পরে আবহাওয়া কেমন হবে?
উত্তর: রবিবার থেকে ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হবে এবং তাপমাত্রা সামান্য বাড়বে।
শেষ কথা:
দক্ষিণবঙ্গে এই মুহূর্তে আকাশ যতই ঘন মেঘে ঢাকা থাকুক না কেন, প্রকৃতির এই বৃষ্টি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে— প্রকৃতি নিজের মতো করে চলতে জানে। সতর্ক থাকুন, নিরাপদে থাকুন, আর উপভোগ করুন এই বর্ষার শেষ দিকের সুন্দর বৃষ্টিময় দিনগুলো। 🌧️💙
