এসআইআর নিয়েই উত্তাল বাংলা! বিজেপির পরিকল্পনা নাকি নতুন ‘ভোট কৌশল’?”

উৎসবের মরশুম শেষ হতে না হতেই ফের রাজ্য রাজনীতিতে গরম হাওয়া। আগামী ছ’মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। কে আসবে ক্ষমতায়, কে যাবে—তা নিয়েই এখন তীব্র রাজনৈতিক জল্পনা। কিন্তু তারও আগে সামনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এসআইআর বা ইনটেনসিভ রিভিশন অফ ভোটার লিস্ট। এই বিষয় নিয়েই এখন তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে।
কী হচ্ছে এসআইআর?
নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়াই হল এসআইআর। এতে পুরনো ভোটার লিস্টের সঙ্গে বর্তমান লিস্ট মেলানো হয়। যারা মৃত বা দ্বৈত নাম ব্যবহার করেছেন, তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করা হয়। কমিশনের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করা যাবে।
সূত্র বলছে, আজই দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে ১০টি রাজ্যের এসআইআর সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করতে পারে নির্বাচন কমিশন। সেই তালিকায় থাকতে পারে পশ্চিমবঙ্গও। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই বলেছে—“এসআইআরের পরই ভোট।”
তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে—একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন যদি স্বশাসিত হয়, তাহলে বিজেপি কীভাবে আগেভাগে এই ঘোষণা করে? এখান থেকেই শুরু নতুন রাজনৈতিক কাঁটাছেঁড়া।
বিজেপির দাবি—কম দফায় ভোট, তাহলেই নিরপেক্ষতা
বিজেপির দাবি, পশ্চিমবঙ্গে ২ থেকে ৩ দফায় ভোট শেষ করা উচিত। দলের সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন,
“৭-৮ দফায় ভোট হলে তৃণমূলেরই সুবিধা। কারণ, ওরা যত সময় পাবে, ভোট ম্যানেজমেন্টে ততই সক্রিয় হবে। দার্জিলিং থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত ভোটে কারচুপি করা ওদের পুরনো কৌশল।”
লকেটদেবীর কথায়, কম দফায় ভোট হলে সেই সুযোগ আর থাকবে না। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রও বলছে, দফা কমালে কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন সহজ হয় এবং গোষ্ঠী সংঘাতের আশঙ্কাও কমে।
তৃণমূলের পাল্টা জবাব—“গেরুয়া শিবির চাপ দিচ্ছে কমিশনে”
তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
“বিজেপি আগেও কমিশনকে চাপে রেখে ভোটের সময় ও দফা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাংলার মানুষ সব সময় উন্নয়ন ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থেকেছে। তাই ওরা এখন ছুতো খুঁজছে—এসআইআর, দফা, ভোটার তালিকা ইত্যাদি।”
তৃণমূলের দাবি, বিজেপি জানে ভোটে মানুষের সমর্থন কমছে, তাই কম সময়ের মধ্যে ভোট করিয়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি কমাতে চায় তারা।
কমিশনের বক্তব্য
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন—
“কত দফায় ভোট হবে, তা সম্পূর্ণভাবে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। আমরা শুধুমাত্র প্রস্তুতিমূলক দায়িত্ব পালন করি। ৩ দফায় ভোট হওয়া সম্ভব—তবে তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রাপ্যতা ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর।”
অর্থাৎ এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বিহার মডেল কি অনুসরণ করবে বাংলা?
পাশের রাজ্য বিহারে আগামী মাসেই নির্বাচন। সেখানে ২৪৩টি আসনে ৬ ও ১১ নভেম্বর ভোট, আর ১৪ নভেম্বর ফলাফল ঘোষণা।
বাংলায় ২৯৪টি আসন। সেই হিসেবে ৩ দফায় ভোট সম্ভব, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা বিতর্কিত।
২০১১ সালে ৮ দফায় ভোট হয়েছিল—তখনই ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার শেষ হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল ক্ষমতায় আসে।
২০১৬ ও ২০২১—দু’বারই ৬ দফায় ভোট হয়েছে এবং দু’বারই তৃণমূল জিতেছে। তাই বিজেপির দাবি, বেশি দফায় ভোট হলে তৃণমূল সুবিধা পায়।
ভোটারদের প্রশ্ন—“আমার নাম কি থাকবে?”
এখন রাজ্য জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল—SIR-এর পর ভোটার তালিকায় নিজের নাম থাকবে তো?
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ইতিমধ্যেই ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট প্রকাশ হয়েছে। সেখানে ভোটাররা বাড়িতে বসেই দেখতে পারবেন তাঁদের নাম আছে কি না।
যাদের নাম নেই বা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁদের নাম বাদ পড়তে পারে।
ভোটার তালিকায় একই ব্যক্তির দুটি এপিক নম্বর থাকলে একটি জায়গা থেকে নাম কাটা যাবে।
কমিশনের যুক্তি, “ভুয়ো ভোটাররা যেভাবে একাধিক নথি তৈরি করে, তা রুখতে ২০০২ সালের ভোটার লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে নাগরিকত্ব যাচাই সহজ হবে।”
অংশ না নিলে কী হবে?
এসআইআর নিয়েই উত্তাল বাংলা! বিজেপির পরিকল্পনা নাকি নতুন ‘ভোট কৌশল’?”
যদি কোনও ভোটার এসআইআরে অংশ না নেন, তাহলে নতুন ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকবে না। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের ভোটে তিনি ভোট দিতে পারবেন না।
এসআইআর ম্যাপিং কী?
২০০২ সালে রাজ্যে ভোটার ছিল ৪.৫৮ কোটি। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৭.৬৫ কোটি।
এই দুই তালিকা মিলিয়ে যাদের নাম মিলবে, তারা ‘চিহ্নিত ভোটার’। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এসআইআরের মূল কাজ শেষ হলে এক মাস পর খসড়া তালিকা প্রকাশিত হবে।
ভুল বা বাদ পড়া নামের জন্য তখন অভিযোগ জানানো যাবে। https://www.newsonair.gov.in
কেন এই নতুন প্রক্রিয়া?
নির্বাচন কমিশনের দাবি, প্রতি বছর ভোটার তালিকা সংশোধন করা হলেও অনেক ত্রুটি রয়ে যায়। তাই এবার শুরু হয়েছে “নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া”—যাতে মৃত বা ভুয়ো ভোটার বাদ পড়ে এবং নতুনরা সহজে যুক্ত হয়।
সম্প্রতি কমিশন চালু করেছে ‘ই-সাইন’ সিস্টেম—যাতে অনলাইনে ভোটার নাম তোলা, বাদ দেওয়া বা সংশোধনের সময় আধার-লিঙ্কযুক্ত মোবাইল দিয়ে যাচাই করতে হয়। এতে জাল আবেদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌম্যজিত দত্ত বলেন,
“ভোটের দফা যত কম হবে, বিজেপির প্রশাসনিক সুবিধা বাড়বে। তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী হওয়ায় দীর্ঘ ভোট তাদের পক্ষে যায়। তাই এখন থেকেই দফা নিয়েই tug of war শুরু।”
অন্যদিকে, তৃণমূল ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি,
“এসআইআরের আড়ালে আসল উদ্দেশ্য হল নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো। বাংলার মানুষ তা বুঝে গেছে।”
শেষ কথা
ভোট মানেই বাংলার রাজনীতিতে উত্তাপ, আবেগ, কৌশল—সব একসঙ্গে। এবারের এসআইআর যেন সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে কমিশন চায় নির্ভুল ভোটার তালিকা, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলির দফা-দফা চাপ।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬-এর ভোট হবে কয় দফায়, তা সময়ই বলবে। তবে এটা স্পষ্ট—এসআইআরের পর রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ বদলে যেতে পারে একেবারে ভিতর থেকে।
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
প্রশ্ন ১: এসআইআর কী?
উত্তর: এসআইআর মানে Intensive Revision — ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া।
প্রশ্ন ২: ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট কেন দেখা জরুরি?
উত্তর: কারণ এবার কমিশন ২০০২ সালের লিস্টের সঙ্গে বর্তমান ভোটারদের মিলিয়ে নাগরিকত্ব যাচাই করছে।
প্রশ্ন ৩: যদি নাম বাদ যায়?
উত্তর: খসড়া তালিকা প্রকাশের পর অভিযোগ জানিয়ে নাম ফেরানো যাবে।
প্রশ্ন ৪: ভোটের দফা কে ঠিক করে?
উত্তর: জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশ্ন ৫: ৩ দফা ভোট হলে কার লাভ?
উত্তর: বিজেপির দাবি, এতে কারচুপি কমবে। তৃণমূল বলে, এটি গেরুয়া রাজনীতির পরিকল্পনা।
Read more :
👉 ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট ফাঁস! আপনার নাম আছে কি না দেখুন, না থাকলে কী বিপদ হতে পারে জেনে নিন
👉 Bank Holiday Alert : 27 अक्टूबर से 2 नवंबर तक बैंक रहेंगे ठप – पूरी लिस्ट जारी
👉 অপরণা সেনের জীবনের গোপন রহস্য ফাঁস করলেন সুমন ঘোষ! জানলে অবাক হবেন

[…] […]
[…] […]