ধর্ম নয়, যুক্তির জয়! সিঁদুর-পরা মহিলার প্রবেশে তোলপাড় নাস্তিক সম্মেলন - NamasteSamachar

ধর্ম নয়, যুক্তির জয়! সিঁদুর-পরা মহিলার প্রবেশে তোলপাড় নাস্তিক সম্মেলন

Spread the love

মঙ্গলবার উত্তর কলকাতার একটি পরিচিত স্থানে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য চোখে পড়ল। ঠিক সেই সময়, ঠিক সেই মঞ্চে — হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর পরিহিত এক বৃদ্ধা হাজির হয়ে গেলেন। তিনি এসেছেন নাস্তিক সম্মেলন-এ। এই দৃশ্যই ছিল সামনে বেশ বিতর্কিত ও ভাবনার উদ্রেককারী।

সম্মেলনের পরিধি ও উদ্দেশ্য

এই সম্মেলন কলকাতা জেলার প্রথম ধরনের উদ্যোগ। এখানে বক্তা ও প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছেন — মূল বিষয় ছিল ধর্মীয় জিজ্ঞাসা, ধর্মচর্চার মেরুকরণ (polarisation), এবং যুক্তিবাদ (rationalism) প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা।
একদিকে ধর্মানুভূতির গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছিল; অন্যদিকে আলোচনায় উঠে এলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম (institutional religion) ও তার কার্যকলাপের বিপদ।

পোশাক ও পরিচয়ের সংঘর্ষ

মঞ্চে হাজির একাধিক ব্যক্তির পোশাক-আচরণ নিজেই প্রশ্ন তুলেছে। কেউ ছিলেন স্পষ্ট নাস্তিক — অর্থাৎ ঈশ্বর বা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস নেই।  অন্য কেউ ছিলেন সন্দেহবাদী (agnostic) বা ধর্মচর্চার প্রতি নিরাসক্ত। কিন্তু পোশাক-পরিচয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল না: সিঁদুর-শাঁখা-পলা, বিয়ে-সংক্রান্ত চিহ্ন, সামাজিকভাবে স্বীকৃত বৈবাহিক পরিচয়ের চিহ্ন— এ সবই দেখা গেল।
উদাহরণস্বরূপ টালিগঞ্জের বাসিন্দা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় – তাঁর স্বামী ঘোর নাস্তিক। প্রতিমা এখনও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সিঁদুর-শাঁখা-পলা পরেন। তাঁর মন্তব্য ছিল, “আমরা বাড়িতে পুজোআচ্চা করি না, আমার সেই বিশ্বাস নেই—তবুও বাইরে সিঁদুর-শাঁখা-পলা পরি।” এই কথা দিয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় এবং সম্মেলনের উদ্দেশ্যের মাঝকার সংঘাত তুলে ধরেছেন।

ধর্মানুভূতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

সম্মেলনের এক বক্তা, সমাজতাত্ত্বিক ও প্রবন্ধকার আশিস লাহিড়ী, ভাষণে বলেছিলেন,

“ধর্মানুভূতি এক জিনিস। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম — অর্থাৎ মন্দির, মসজিদ, গির্জা গড়ার কার্যকলাপ — তা একেবারে ভিন্ন।”
এই বক্তব্যের মূল থিম ছিল: সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মানুভূতির সঙ্গে ধর্ম-প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এমনকি ধর্মচর্চায় সরকারি অনুদান বা ধর্ম-সংস্থার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

আবেগ ও যুক্তির মিলে জয়াপ্লব

অনেকের ধারণা হয়, নাস্তিকতা মানেই ঠাণ্ডা যুক্তি বা আবেগহীনতা। কিন্তু এই সম্মেলনে তা পুরোপুরি প্রযোজ্য হলো না। এক আলোচক বললেন, “ক্রিকেট খেলার আগে যজ্ঞ করা একরকম আবেগ, আর খেলে জেতার পর কান্নার মধ্যেও আবেগ আছে।” এখানে জেমাইমা রদ্রিগেজ়-র উদাহরণ দেওয়া হয় — যিনি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন, এবং জিতে ওঠার পর আবেগে কাঁদিয়েছিলেন। মঞ্চে বলছিলেন: যজ্ঞ-অনুষ্ঠান-উন্মাদনা আর সাফল্যের আবেগ এক-অপরের সঙ্গে মেশা কিন্তু যুক্তি-ভিত্তিক নাস্তিক হতেও যায়।
এটি স্পষ্ট করে যে, নাস্তিকতা শুধু যুক্তি বা পর্যবেক্ষণ নয়, বরং মানুষের আবেগ, ব্যক্তিগত ইতিহাস, ও অনুভূতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

ইতিহাস ও ধ্রুপদী ধারায় নাস্তিকতার উৎস

ভারতের প্রাচীন দার্শনিক ধাঁচেও নাস্তিক বা নাস্তিকবাদ (atheism)-র নমুনা রয়েছে। চার্বাক দর্শন হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা—যেটি প্রাচীনকালে বেদবিচার বা আধ্যাত্মিক ধারণাকে সরাসরি বাতিল করেছিল।  এই সম্মেলনের এক বক্তার দাবি ছিল, “দেশে অনেক বিজ্ঞানি বা যুক্তিবাদী সংস্থা আছে তবুও এক-মাত্র নাস্তিক মঞ্চ গড়ার প্রয়োজন কেন?” উত্তরে বলা হয়: কারণ পুরনো সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বললেও, ‘প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচর্চার’ বিষয়টি নীরবে তারা পাস করেছে। তাই নতুন মঞ্চ প্রয়োজন যা ধর্ম-চর্চার দিয়েই যুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন তুলবে।

ব্যক্তিগত গল্প ও সামাজিক সংকেত

মোরাল বা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সম্মেলনের উপস্থিতি বড়-ই সাংকেতিক। যেমন: গত সেপ্টেম্বর মাসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-র একটি ঝিলে ডুবে মৃত পড়ুয়া অনামিকা মণ্ডল—তার মা মীনাক্ষী মণ্ডল প্রকাশ্যেই বলছেন, মেয়ের মৃত্যুর পরে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ী হয়েছেন। তিনি নিজে আসতে না পারলেও সম্মেলনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। এসব ব্যক্তিগত ঘরোয়া ঘটনায় মানুষের ধর্মচিন্তা, বিশ্বাস ও সংশয়ের লড়াই উঠে আসে।
আপনি ভাবতে পারেন—হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর পরা নারী কেন এই মঞ্চে? কারণ এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচয়ের সংশয়, আবেগ ও যুক্তির এক মেলবন্ধন।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সমাজে প্রভাব

ধর্ম নয়, যুক্তির জয়! সিঁদুর-পরা মহিলার প্রবেশে তোলপাড় নাস্তিক সম্মেলন

এই ধরনের সম্মেলন শুধু একদিনের কথা নয়—এটি এমন একটি সুচিন্তা-আন্দোলনের সূচনা। এখানে উঠে আসে একটি বড় প্রশ্ন: ধর্মের প্রসার ও সামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্তি ও সন্দেহবাদের স্থান কি হবে? মঞ্চে এক তরুণ রামধনু পতাকা জড়িয়ে বললেন,

“আজ এই হল ভরেছে। একদিন স্টেডিয়ামও ভরাব!”
একের পর এক বক্তা বলছেন—নাস্তিকতা শুধু বিশ্বাসহীনতা নয়, এটি সচেতন সংশয়। আর সেই সংশয় সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারে—যেখানে পুরনো বন্ধন ভেঙে নতুন চিন্তার পথ খোলা যায়।

সংক্ষেপে

  • “নাস্তিক সম্মেলন” এমন একটি স্থান যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক পরিচয়, সন্দেহ ও যুক্তি — এই সব মিশে গেছে।

  • মানুষের পোশাক-চিহ্ন বা সামাজিক পরিচয় তাদের চিন্তা-ভাবনায় বাধা নয়, বরং সেই পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

  • এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, সমাজ-রীতি এবং যুক্তি-চিন্তার মধ্যে সামঞ্জস্য খোঁজা হয়েছে।

  • ব্যক্তিগত গল্প ও সামাজিক উদ্যোগ একসঙ্গে উঠে এসেছে—বিশেষ করে যখন কেউ ধর্ম-চর্চায় নেই অথচ সামাজিক বন্ধন বজায় রাখছেন।

  • এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে সমাজে বৃহত্তর প্রভাব ফেলতে পারে — যেখানে ব্যাক্তিগত বিশ্বাস ও সমাজ-চিন্তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন :

আরও স্পষ্ট নিম্নচাপ! উত্তাল থাকবে সমুদ্র, দক্ষিণবঙ্গে ফের বৃষ্টি — আলিপুরের বড় সতর্কতা

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *