পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তেজনা। মুখ্যমন্ত্রী মুখে বলছেন, ভোটার হিসেবে তিনি ঠিকভাবে যুক্ত থাকতে চান। তাই হয়তো না হয়তো, বুধবার সকালবেলায় কালীঘাটের নিজের বাসভবনে পৌঁছান বিএলও (বুথ-স্তরের অফিসার)-র সংস্পর্শে। এক হাতে নেয়া হয় ‘এসআইআর এনুমারেশন ফর্ম’ — যা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই ঘটনাটি শুধু এক প্রশাসনিক মুহূর্ত নয় — রাজনৈতিক, সামাজিক ও নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, সময়-সাপেক্ষতা, কেন্দ্র বা রাজ্য-ভিত্তিক বৈষম্য, এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পক্ষান্তরে, নির্বাচন কর্তৃপক্ষ বলছে, সময় এসেছে পরিপুষ্ট, সঠিক ভোটার তালিকা তৈরির।

image credit: The Hindu
নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো — ঘটনাপ্রবাহ, প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সাধারণ ভোটারের জন্য নির্দেশিকা সহ।
ঘটনার বিবরণ
বুধবার সকালে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটে নিজের বাসভবনে যাঁর বাস (হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট) সেখানে পৌঁছান এক বুথ-অফিসার — বিএলও অমিতকুমার রায়। তিনি মিত্র ইনস্টিটিউশন ভোটকেন্দ্রের ৭৭ নম্বর বুথের দায়িত্বে ছিলেন।
বিএলও ছিলেন ‘এনুমারেশন ফর্ম’ হাতে নিয়ে — ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। ওই ফর্মটি মুখ্যমন্ত্রীর নিজ হাতে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ফর্মটি পূরণ করে তিনি অফিস থেকে জানানো হলে ফেরত দেবেন।
তবে শুধু হস্তান্তর নয় — কিছু মাত্র নিরাপত্তা-প্রটোকলও ছিল। বিএলওকে প্রথমে সশরীরে ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি; পুলিশ বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। শেষে বিএলওকে প্রবেশ করতে বলা হয় শর্ত দিয়ে — মোবাইল ও ব্যাগ নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা। এরপর ঘর থেকে মুখ্যমন্ত্রী নিজে বেরিয়ে এসে ফর্ম গ্রহণ করেন।
এই ঘটনাটি ঘটে যখন পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে এবার এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিএলও-রা ঘরে ঘরে গিয়ে বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছেন, ভোটারদের হাতে এনুমারেশন ফর্ম তুলে দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে সে প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে পড়েছেন — যা রাজনৈতিকভাবে বড় ইঙ্গিত বহন করছে।
প্রেক্ষাপট: ‘এসআইআর’ কী?
বিধানসভা ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর দরজায় বিএলও! নিজের হাতে নিলেন এসআইআর ফর্ম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
‘এসআইআর’ বা Special Intensive Revision হলো এক বিশেষ বৃহৎ নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ — ভোটার তালিকা একাধিক কারণে সঠিক রাখতে तथा অনিয়ম, দ্বৈত তালিকা, মিথ্যা অন্তর্ভুক্তি, প্রবাসী-অভিবাসীদের বিষয় নিয়ে পরিপূর্ণতা আনতে।
মূল উদ্দেশ্য
-
যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় থাকা উচিত ছিল কিন্তু নেই — তাঁদের অন্তর্ভুক্তি।
-
যাঁর তালিকা রয়েছে কিন্তু আর ভোট দেওয়ার যোগ্য নয় — যেমন প্রয়াত, অন্য স্থানে স্থায়ীভাবে চলে গেছেন, অনধিকারভুক্ত বিদেশি নাগরিক ইত্যাদি — তাঁদের নাম সংশোধন বা বাদ দেওয়া।
-
দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যার পরিবর্তন, অভিবাসন, একাধিক ভোটার রেজিস্ট্রি এসব কারণে দীর্ঘ সময়ে তালিকা সঠিক রাখা সম্ভব হয়নি — তাই এখন সময় এসেছে বড় রদবদল ও যাচাই-পরীক্ষার।
পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য রাজ্য
এইবার দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২টি রাজ্য-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে এই এসআইআরের প্রক্রিয়া ঘোষণা করা হয়েছে — যার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল ইত্যাদি।
এই প্রক্রিয়া আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্পন্ন হবে বলছে নির্বাচন কমিশন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বিতর্ক
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক দিক দিয়ে বেশ আলোচনা চলছে — বিশেষ করে রাজ্য-স্তরে শাসকদল এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন সংস্থার মধ্যে।
তৃণমূলের আপত্তি
All India Trinamool Congress (তৃণমূল) বলছে — পদ্ধতি, সময় এবং একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে এইরকম তাড়াহুড়ো কেন করা হচ্ছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
তৃণমূলের বক্তব্য, ২০০২ সালে যখন এসআইআর হয়েছিল, তখন দুই বছরের বেশি সময় নেওয়া হয়েছিল। এখন মাত্র কয়েক মাসেই সব শেষ করার চাওয়া — যা হয়তো বাধ্যকর নয়।
তাছাড়া, এক প্রশ্ন হচ্ছে — বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে, অথচ এই ধরনের তালিকা সংশোধন অন্য সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে কেন একইভাবে চলছে না? তৃণমূল বলছে, বিজেপির সুবিধার জন্য সুনির্দিষ্ট রাজ্যে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
Election Commission of India (ইসি) বলছে — সময় এসেছে সঠিক, নির্ভুল ও সংশোধিত ভোটার তালিকা করার। যেসব নাম অনৈধভাবে তালিকায় রয়েছে (যেমন একাধিক স্থান থেকে ভোট দেওয়া, নির্ধারিত বয়সে নেই, মারা গেছেন, বিদেশি নাগরিক) সেসব বাদ দেওয়া প্রয়োজন।
ইসির দাবি — ‘‘কোনো একমাত্র genuine ভোটার বাদ পড়বেন না’’।
বিতর্কের দিক
-
কিছু সমালোচক বলছেন, এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় যুক্তি নিয়ে নয় — রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাড়াহুড়োয় চালু করা হচ্ছে। যেমন, ভোট-আসন্ন রাজ্যে আগে তালিকা সাফ-সুতরো করার প্রচেষ্টা।
-
অন্যদিকে, অনেকে বলছেন — যদি খুব দ্রুত তালিকা পরিবর্তন হয়, তাহলে সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্তি হতে পারে, নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি অসম্ভব হবে।
-
আরও বলা হচ্ছে — এই প্রক্রিয়াতে সংস্লিষ্ট দলগুলোর পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ বা জনগণের সচেতনতা নেওয়া হয়নি; উদ্বাস্তু, অভিবাসী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের জন্য ঝুঁকি রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী এবং এই ঘটনা — কেন গুরুত্ব পাচ্ছে?
মুখ্যমন্ত্রী নিজে ‘বেছে’ এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন — নিজের হাতে ফর্ম নেওয়া, ফিরে দেবার কথা দেওয়া। এমন একটি প্রেক্ষাপট সাধারণত হত না; তাই এটি রাজনৈতিকভাবে একটি বড় বার্তা দিচ্ছে।
-
এটি একটি ভিডিও/ছবির জন্যও হওয়া উপযুক্ত মুহূর্ত — ‘মুখ্যমন্ত্রী ভোটার’ হিসেবে নিজেকেই উপস্থাপন করছেন।
-
একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রতীক হিসাবেও দেখা যেতে পারে — বুথ-স্তরের অফিসার তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে।
-
তৃণমূল বা অন্যান্য বিরোধীরা বলছেন — এটা একটি চিত্রনাট্য বা প্রচারণামূলক ভাব থাকতে পারে। কারণ ভোটের আগে এমন দৃশ্য সাধারণ নয়।
-
সাধারণ ভোটারের দৃষ্টিকোণ থেকেও — যদি রাজ্যের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজে ফর্ম গ্রহণ করছেন, তাহলে হয়তো কয়েক-কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর হবে সহজ: “আমার নাম আছে কি না?”, “এই প্রক্রিয়া কি সঠিক রয়েছে?” ইত্যাদি।

সাধারণ ভোটারের জন্য কি করতে হবে?
যারা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার বা হইতে পারেন — বিশেষ করে যাঁদের নাম নতুন বা সংশোধনের দৃষ্টিতে রয়েছে — তাঁদের জন্য কিছু নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো:
-
দেখুন আপনার তালিকায় নাম আছে কি না — সময়মতো ‘এনুমারেশন ফর্ম’ বিএলও/বুথ-অফিসার থেকে পেয়েছেন কি না।
-
ফর্ম পূরণ করে ঠিক মত জমা দিন — আপনার তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না দেখুন।
-
যদি আপনার নাম না থাকে, বা সংশোধন দরকার হয় — দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অফিসে অভিযোগ বা আবেদন নিন।
-
পরিচয়পত্র ও ঠিকানার প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখুন। (এ গুলো প্রক্রিয়া সহজ করতে সাহায্য করবে)
-
রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কথাবার্তা শুনে ভয় করবেন না — আপনার ভোটাধিকার সুরক্ষিত। যদি কোনো অসুবিধা হয়, সংশ্লিষ্ট BLO/ERO-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
উপসংহার
এই এক দৃশ্য — মুখ্যমন্ত্রী নিজে ফর্ম নিলেন, বুথ-অফিসার গেলেন বাসায় — তা শুধু একটি নির্বাচনী ফর্মালিটি নয়। এটি ভোটের সামনে দাঁড়িয়ে একটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বার্তা বহন করছে।
এই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটাধিকার নিয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়বে; কিন্তু যদি অংশগ্রহণ ও সঠিক শ্রবণ না থাকে, তাহলে সংশোধনের পর আরও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে।
এই প্রতিবেদনে আমরা সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছি — কি ঘটল, কেন ঘটল, কার্যপদ্ধতি কি, সাধারণ ভোটারের জন্য কি করণীয়। নির্বাচনের আগে এই ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই মনোযোগ দাবি করে।
আপনি যদি চান, তাহলে আমি পুরো ঘটনাটির সঙ্গে ভোটার তালিকার পরিবর্তন, রাজ্য-উপলক্ষে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রভাব সহ একটি ব্যতিক্রমধর্মী বিশ্লেষণও করতে পারি। করবেন কি?
আরও পড়ুন :
আরও স্পষ্ট নিম্নচাপ! উত্তাল থাকবে সমুদ্র, দক্ষিণবঙ্গে ফের বৃষ্টি — আলিপুরের বড় সতর্কতা

[…] বিধানসভা ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর দরজ… […]