মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রকে চিঠি: গোর্খাল্যান্ড মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ বাতিলের দাবি

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও সরব হলেন কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এবার তাঁর ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু —গোর্খাল্যান্ড ইস্যুতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী বা ইন্টারলোকিউটর নিয়োগ। এই বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি কড়া ভাষার চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে এই পদক্ষেপ সংবিধানবিরোধী এবং রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ।
চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, গোর্খাল্যান্ড সংক্রান্ত বিষয়টি একান্তই রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পাহাড়ের মানুষ, গোর্খাল্যান্ড জনমুক্তি মোর্চা (GJM) এবং অন্যান্য স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে রাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কেন্দ্র যদি নিজস্ব একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে, তা রাজ্যের উপর এক প্রকার ‘অবিশ্বাস প্রদর্শন’-এর সমান।
কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ নবান্ন
সূত্রের খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সম্প্রতি গোর্খাল্যান্ড সংলাপ চালানোর জন্য একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তে রাজ্য সরকারের অনুমতি বা মতামত নেওয়া হয়নি। ফলে নবান্নে অসন্তোষের বাতাবরণ তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, কেন্দ্র এইভাবে হস্তক্ষেপ করলে রাজ্যের শান্তিপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিঠিতে লেখেন —
“পাহাড়ের মানুষ আমাদেরই নাগরিক। তাঁদের উন্নয়ন, শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। কেন্দ্র যদি সেখানে আলাদা করে মধ্যস্থতাকারী পাঠায়, তাহলে সেটা রাজ্য সরকারের উপর অবিশ্বাস প্রকাশের সমান।”
তিনি আরও লেখেন, “গোর্খাল্যান্ড নিয়ে রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট — পাহাড় আমাদেরই অংশ, এবং সংলাপ ও উন্নয়নই এর একমাত্র সমাধান।”
পাহাড়ে শান্তি ফিরেছে, বলছে রাজ্য
রাজ্য সরকারের দাবি, গত কয়েক বছরে দার্জিলিং ও কালিম্পং-এ উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। পর্যটন বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মসংস্থানও ধীরে ধীরে বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA) কে শক্তিশালী করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রশাসন চালু আছে।
নবান্নের বক্তব্য — এই অবস্থায় কেন্দ্রের মধ্যস্থতাকারী পাঠানো মানে অপ্রয়োজনীয় রাজনীতি করা। এটি শুধু রাজ্য-কেন্দ্র সম্পর্কের উপর চাপ সৃষ্টি করবে না, পাহাড়ের মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজ্য সরকার মনে করে, কেন্দ্রীয় সরকার বারবার রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করছে। যেমন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ ব্যবস্থা, বা স্থানীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পাঠানো — এসবই রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চিঠি একপ্রকার প্রতিবাদ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন — পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন পরিচালনা করার অধিকার একমাত্র রাজ্য সরকারের। কেন্দ্র বারবার যদি রাজ্যের ভিতরে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সেটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।”
পাহাড়ের মানুষের প্রতিক্রিয়া
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রকে চিঠি: গোর্খাল্যান্ড মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ বাতিলের দাবি
গোর্খাল্যান্ড ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়বাসীর আবেগের সঙ্গে যুক্ত। একসময় আলাদা রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল, যার ফলে দার্জিলিংয়ে হিংসা, অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত।
দার্জিলিংয়ের এক স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “আমরা চাই শান্তি বজায় থাকুক। কেন্দ্র ও রাজ্য যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে পাহাড়ের উন্নয়ন হবে। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়লে আবার পুরনো দিন ফিরে আসবে।”
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “পর্যটনের মরশুমে এখন প্রচুর মানুষ আসছেন। যদি রাজনৈতিক অশান্তি বাড়ে, তাহলে ক্ষতি আমাদেরই হবে।”
রাজনীতির অন্দরে প্রতিক্রিয়া
বিজেপির রাজ্য নেতারা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের দাবি, গোর্খাল্যান্ড সমস্যা বহুদিনের, এবং কেন্দ্রের মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। বিজেপির এক নেতা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো ভয় পাচ্ছেন যে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে পাহাড়ে বিজেপির প্রভাব বাড়তে পারে, তাই তিনি এতটা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।”
অন্যদিকে, বাম ও কংগ্রেস শিবিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাঁদের বক্তব্য, পাহাড়ের সমস্যা সংবেদনশীল, তাই রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়েরই উচিত একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
মমতার বার্তা — সংবিধানের প্রতি সম্মান রাখুন
চিঠির শেষে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যগুলির স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সম্মান জানাতে। তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই একই দেশের অংশ। কিন্তু সংবিধান রাজ্যগুলিকে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। সেই ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করা মানে রাজ্যগুলিকে দুর্বল করা।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান তাঁর আগের নীতি ও বক্তব্যের সঙ্গে একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বহুবার বলেছেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সহযোগিতা থাকা উচিত, কিন্তু তা যেন ‘বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণে’ না পরিণত হয়।
বিশ্লেষণ: কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে নতুন অধ্যায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চিঠি শুধুমাত্র গোর্খাল্যান্ড ইস্যু নয় — এটি আসলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক শক্ত বার্তা। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব বেড়েছে — যেমন, রাজ্যপালের ভূমিকা, কেন্দ্রীয় তহবিল, বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে মমতার এই পদক্ষেপ আবারও তুলে ধরল যে, তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রশ্নে কোনওরকম আপস করতে রাজি নয়।
উপসংহার
গোর্খাল্যান্ড প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চিঠি রাজনীতি, প্রশাসন ও পাহাড়ের ভবিষ্যৎ—সব ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র কীভাবে এই চিঠির জবাব দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট — পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের যে পথে রাজ্য এগোচ্ছে, সেখানে নতুন করে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত সৃষ্টি হলে তা কারওই পক্ষে মঙ্গলজনক হবে না।
এটাও দেখুন
👉 কলকাতায় অবৈধ জুয়া খেলার আসরে ১৯ জন গ্রেফতার — পুলিশের হানায় চাঞ্চল্য
