মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন — ‘কলকাতা সবচেয়ে নিরাপদ শহর, বিজেপিই সবচেয়ে অনিরাপদ দল’

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও রাজ্যের নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং রাজনীতির সংস্কৃতি নিয়ে মন্তব্য করে রাজনৈতিক অঙ্গনকে সরগরম করে তুলেছেন। এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “কলকাতা এখন ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ শহর। কিন্তু বিজেপি আজ দেশের সবচেয়ে অনিরাপদ দল।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা ও বিতর্ক।
কলকাতার নিরাপত্তা নিয়ে মমতার দাবি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের সরকার শহরের নিরাপত্তা বাড়াতে যেভাবে কাজ করছে, তা আজ দেশের অন্য রাজ্যগুলির জন্য উদাহরণ। কলকাতার রাস্তা, ট্রাফিক, নজরদারি ক্যামেরা, পুলিশি টহল—সব কিছু মিলিয়ে আমরা শহরটিকে আরও নিরাপদ করে তুলেছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এখন মানুষ রাতে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারেন। মেয়েরা কলেজ থেকে, অফিস থেকে রাতেও ফিরে আসতে পারে কোনও ভয় ছাড়াই। কলকাতা এখন ভারতের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ এবং সভ্য শহর।”
গত কয়েক বছরে কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসন শহরে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির ব্যবস্থা করেছে। সর্বত্র লাগানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা, চালু হয়েছে নারী হেল্পলাইন, সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ প্রকল্প, এমনকি প্রতিটি থানায় বিশেষ মহিলা ডেক্সও তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “এই সমস্ত পদক্ষেপের জন্যই আজ কলকাতা সারা দেশের মধ্যে নিরাপত্তার দিক থেকে প্রথম সারিতে।”
বিজেপিকে আক্রমণ
তবে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এখানেই থেমে যাননি। তিনি তীব্র আক্রমণ করেন বিজেপিকে। তাঁর ভাষায়, “আজকে যারা দেশের রাজনীতি নষ্ট করছে, ঘৃণা ছড়াচ্ছে, সমাজে বিভেদ আনছে, তারাই আসলে অনিরাপদ। বিজেপির ভিত নড়ে গেছে। তাই ওরা এখন ভয় দেখানোর রাজনীতি করছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিজেপির নেতারা দিনের পর দিন মিথ্যে প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু বাংলার মানুষ বোঝে—কারা কাজ করছে আর কারা শুধু দোষারোপ করছে। বিজেপির কাছে না আছে উন্নয়নের রোডম্যাপ, না আছে মানুষের জন্য কোনও পরিকল্পনা। তাই ওরা আজ নিজেরাই অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।”
এই বক্তব্যে মমতা আসলে বোঝাতে চেয়েছেন যে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান এখন দুর্বল। দলটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং একাধিক রাজ্যে তাদের সংগঠনেও টানাপোড়েন চলছে।
মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর তৃণমূলের নেতারা একযোগে তাঁর বক্তব্যের সমর্থন করেছেন। দলের মুখপাত্র বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলেছেন, সেটাই বাস্তব। কলকাতা আজ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহর। মহিলাদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকার সফল।”
তৃণমূলের আরেক নেতা বলেন, “বিজেপি আজ ভয় এবং বিভেদের রাজনীতি করছে। কিন্তু মানুষ এখন বুঝে গেছেন, কারা উন্নয়নের রাজনীতি করে আর কারা ধ্বংসের।”
বিজেপির পাল্টা মন্তব্য
অন্যদিকে, বিজেপি অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে কটাক্ষ করেছে। রাজ্য বিজেপির এক মুখপাত্র বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এমন কথা বলছেন। কলকাতায় প্রতিদিন অপরাধ হচ্ছে, দুষ্কৃতীরা প্রকাশ্যে হামলা করছে। তবু মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন শহরটি সবচেয়ে নিরাপদ!”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিজেপি অনিরাপদ নয়, বরং মানুষ আমাদের পাশে আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গেছেন তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে, তাই বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি নিজের রাজনৈতিক মাটিটা মজবুত রাখতে চাইছেন।”
নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলকাতায় অপরাধের হার গত তিন বছরে অনেকটাই কমেছে। ট্রাফিক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধ—সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ এসেছে। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-এর প্রতিবেদনেও কলকাতা একাধিকবার ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ মহানগরীর শিরোপা পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্য সরকারের “Safe Drive Save Life” এবং “Safe City Project”-এর ফলেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও কলকাতা পুলিশের আধুনিকীকরণ, টহলদারি বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার শহরকে আরও সুরক্ষিত করেছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, “শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সব বোঝানো যায় না। এখনও অনেক এলাকায় রাতের বেলা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে, বিশেষ করে শহরতলিতে।”
মমতার বার্তা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন — ‘কলকাতা সবচেয়ে নিরাপদ শহর, বিজেপিই সবচেয়ে অনিরাপদ দল’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল বার্তা ছিল—বাংলা শান্তির রাজ্য, যেখানে সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে থাকেন। তিনি বলেন, “আমরা বিভেদের রাজনীতি মানি না। বাংলার মাটি ঐক্যের মাটি। যারা ঘৃণা ছড়ায়, তারা এখানে টিকতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমার লক্ষ্য একটাই—মানুষের জীবনকে নিরাপদ, সম্মানজনক ও সুন্দর করে তোলা। বিজেপি চায় রাজনীতি দিয়ে মানুষকে ভাগ করতে, কিন্তু আমরা চাই উন্নয়ন দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে।”
উপসংহার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। একদিকে তিনি রাজ্যের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সাফল্য তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বিজেপিকে দুর্বল ও অনিরাপদ হিসেবে চিত্রিত করছেন। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী এইভাবে রাজ্যের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন যে তৃণমূল সরকার নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতীক, আর বিজেপি শুধু বিভেদের রাজনীতি করছে।
তবে বাস্তবে কলকাতা কতটা নিরাপদ, আর বিজেপি কতটা অনিরাপদ—তা সময়ই বলবে। কিন্তু নিঃসন্দেহে, মমতার এই বক্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
FAQs:
Q1: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন বললেন কলকাতা সবচেয়ে নিরাপদ শহর?
Ans: মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, সিসিটিভি, পুলিশি টহল ও সরকারের পদক্ষেপে কলকাতার অপরাধের হার অনেক কমেছে।
Q2: বিজেপি মমতার মন্তব্যে কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছে?
Ans: বিজেপি বলেছে, মমতা নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এমন দাবি করছেন এবং কলকাতার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আসলে তেমন ভালো নয়।
Q3: কলকাতা সত্যিই কি ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ শহর?
Ans: NCRB-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতায় অপরাধের হার দেশের বড় শহরগুলির তুলনায় অনেক কম, তাই শহরটি নিরাপত্তার দিক থেকে শীর্ষস্থানে।
Q4: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
Ans: তাঁর এই মন্তব্য আসন্ন নির্বাচনের আগে বিজেপিকে আক্রমণ ও নিজের সরকারের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এটাও দেখুন
👉 অমিত শাহের অভিযোগ — পশ্চিমবঙ্গ বৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ‘রেড-কার্পেট’ স্বাগতম দিচ্ছে
