কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় নতুন মোড়: WBJEE 2025 মপ-আপ রাউন্ড নিয়ে বিতর্ক

ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশন (WBJEE) প্রতি বছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি হয়ে ওঠে। প্রকৌশল, ফার্মেসি কিংবা টেকনোলজির মতো বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হতে WBJEE-র গুরুত্ব অপরিসীম। পরীক্ষার পর আসে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া, যা ঠিক করে দেয় কে কোন কলেজে সুযোগ পাবে। সাধারণত তিনটি রাউন্ডের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়। তবে ২০২৫ সালের WBJEE কাউন্সেলিং-এ “মপ-আপ রাউন্ড” নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কেউ বলছেন, এই অতিরিক্ত রাউন্ড ছাত্রছাত্রীদের জন্য আশীর্বাদ, আবার অনেকে মনে করছেন এটি অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করছে। তাহলে আসলেই কি হচ্ছে? কেন এত আলোচনা-সমালোচনা? এই পোস্টে আমরা সেই বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব।
WBJEE কাউন্সেলিং কীভাবে চলে?
প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার কাঠামো।
-
প্রথম রাউন্ড (Round 1):
পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধা তালিকা তৈরি হয়। ছাত্রছাত্রীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী কলেজ ও কোর্স নির্বাচন করে। যারা প্রথম রাউন্ডে সিট পায়, তারা চাইলে সেই সিট গ্রহণ করতে পারে অথবা আপগ্রেডের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। -
দ্বিতীয় রাউন্ড (Round 2):
যারা প্রথম রাউন্ডে আপগ্রেড চেয়েছিল বা যারা কোনো সিট পায়নি, তাদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ। এই রাউন্ডে অনেক সময় আরও ভালো কলেজ বা কোর্স পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। -
তৃতীয় রাউন্ড (Round 3):
শেষ অফিসিয়াল রাউন্ড। এখানে ফাইনাল বরাদ্দ হয়। যাদের এখনও সিট মেলেনি, তাদের জন্য এটি শেষ সুযোগ।
তবে এই তিন রাউন্ড শেষ হলেও প্রায়ই দেখা যায় অনেক সিট খালি থেকে যায়। এই জায়গাতেই আসে “মপ-আপ রাউন্ড”।
মপ-আপ রাউন্ড কী?
“মপ-আপ রাউন্ড” আসলে একটি অতিরিক্ত ধাপ।
-
এর মূল উদ্দেশ্য হলো, যে সিটগুলো তিনটি রাউন্ড শেষ হওয়ার পরেও ফাঁকা রয়ে গেছে, তা পূরণ করা।
-
সাধারণত এটি আয়োজন করা হয় যাতে একটিও সিট অপচয় না যায়।
-
অনেক সময় মপ-আপ রাউন্ডে অংশ নিতে আবার আলাদা রেজিস্ট্রেশন ফি বা ডকুমেন্ট যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়।
কেন বিতর্ক তৈরি হয়েছে?
১. ছাত্রছাত্রীদের আশা বনাম বাস্তবতা
অনেক ছাত্রছাত্রী মনে করছেন, মপ-আপ রাউন্ড থাকলে তারা হয়তো আরও ভালো কলেজ বা কোর্স পাবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এই রাউন্ডে শুধুমাত্র অবশিষ্ট সিটগুলো থাকে, যা সবসময় সেরা মানের নয়। ফলে আশা ভঙ্গ হচ্ছে অনেকের।
২. বেসরকারি কলেজের ভূমিকা
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মপ-আপ রাউন্ড আসলে অনেকটা বেসরকারি কলেজগুলির সুবিধার জন্য আনা হয়। কারণ সরকারি কলেজগুলোতে প্রায় সব সিটই ভরে যায় প্রথম তিন রাউন্ডে। খালি সিট থাকে মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাই অনেকের মতে, মপ-আপ রাউন্ড মানে বেসরকারি কলেজের সিট পূরণের চেষ্টা।
৩. অতিরিক্ত খরচ ও ঝামেলা
আবার, মপ-আপ রাউন্ডে অংশ নিতে ছাত্রছাত্রীদের নতুন করে ফি দিতে হয়। যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল, তাদের কাছে এটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
৪. সময়ের অপচয়
তিন রাউন্ড শেষ হওয়ার পর ছাত্রছাত্রীরা মানসিকভাবে স্থির হতে চায়। কিন্তু মপ-আপ রাউন্ডের জন্য আবারও তাদের নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয় এবং অনেকের প্রস্তুতি বিভ্রান্ত হয়ে যায়।
সমর্থনের যুক্তি: কেন দরকার মপ-আপ রাউন্ড?
অন্যদিকে, অনেকেই আবার বলছেন এটি প্রয়োজনীয়।
-
সিট নষ্ট না হওয়া: প্রতিটি সিট মূল্যবান। মপ-আপ রাউন্ড না থাকলে অনেক সিট খালি থেকে যাবে।
-
দ্বিতীয় সুযোগ: অনেক ছাত্রছাত্রী প্রথম তিন রাউন্ডে ভুল পছন্দের কারণে ভালো কলেজ পায়নি। তাদের জন্য এটি বাড়তি সুযোগ।
-
অপেক্ষমাণ তালিকার সুবিধা: কিছু ছাত্রছাত্রী হয়তো ভেবেছিল অন্য কোথাও ভর্তি হবে, পরে সিদ্ধান্ত বদলালে এই রাউন্ড কাজে লাগে।
ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
কলকাতার এক পরীক্ষার্থী অর্পিতা বলছিলেন –
“প্রথম তিন রাউন্ডে আমি পছন্দের কলেজ পাইনি। কিন্তু মপ-আপ রাউন্ড থাকলে অন্তত আরেকবার চেষ্টা করতে পারব।”
অন্যদিকে হাওড়ার অভিভাবক সৌমেনবাবু বলছেন –
“বারবার ফি দেওয়া, বারবার ডকুমেন্ট যাচাই করা – এগুলো সত্যিই বিরক্তিকর। ছাত্রছাত্রীদের মনে চাপ তৈরি হচ্ছে।”
এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়াই বোঝায় বিতর্কটা কতটা বাস্তব।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত
শিক্ষা নীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন –
-
মপ-আপ রাউন্ড একেবারে খারাপ নয়, তবে এর স্বচ্ছতা বজায় রাখা খুব জরুরি।
-
স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন কোন সিট অবশিষ্ট রয়েছে।
-
ফি যেন বেশি না হয় এবং প্রক্রিয়াটি যেন ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহজ হয়।

ভবিষ্যতের প্রভাব
কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় নতুন মোড়: WBJEE 2025 মপ-আপ রাউন্ড নিয়ে বিতর্ক
WBJEE 2025-এ যদি মপ-আপ রাউন্ড চালু থাকে, তাহলে এর কিছু সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে:
-
বেসরকারি কলেজগুলির সিট পূরণ হবে।
-
ছাত্রছাত্রীরা বাড়তি সুযোগ পাবে, তবে তাদের মানসিক চাপও বাড়বে।
-
কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে, যার ফলে একাডেমিক সেশনের শুরু দেরি হতে পারে।
বিতর্কের মূল প্রশ্ন
আসল প্রশ্নটা হলো – মপ-আপ রাউন্ড আসলে কাদের জন্য?
-
এটি কি সত্যিই ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে, নাকি মূলত বেসরকারি কলেজগুলির সুবিধার জন্য?
-
ছাত্রছাত্রীরা কি সত্যিই উপকৃত হচ্ছে, নাকি কেবল বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে?
উপসংহার
WBJEE 2025-এ মপ-আপ রাউন্ড নিয়ে বিতর্ক থামার নয়। একদল মনে করছে এটি সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যরা বলছেন এটি কেবল সময় ও অর্থের অপচয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার – স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখলেই মপ-আপ রাউন্ড ছাত্রছাত্রীদের উপকারে আসতে পারে। নাহলে এটি শুধুই বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: মপ-আপ রাউন্ড কি বাধ্যতামূলক?
না, এটি ইচ্ছাধীন। চাইলে অংশ নেওয়া যায়।
প্রশ্ন ২: মপ-আপ রাউন্ডে সরকারি কলেজের সিট পাওয়া যাবে কি?
সাধারণত সরকারি কলেজে সিট খালি থাকে না। মূলত বেসরকারি কলেজের সিটই থাকে।
প্রশ্ন ৩: মপ-আপ রাউন্ডে কি আবার ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন করতে হবে?
হ্যাঁ, অনেক সময় পুনরায় যাচাই করতে হতে পারে।
প্রশ্ন ৪: মপ-আপ রাউন্ডে অংশ নিতে কি আলাদা ফি দিতে হয়?
হ্যাঁ, সাধারণত আলাদা ফি দিতে হয়।
প্রশ্ন ৫: এই রাউন্ড কাদের জন্য সবচেয়ে উপকারী?
যারা প্রথম তিন রাউন্ডে কোনো সিট পায়নি, অথবা পেয়ে থাকলেও পছন্দসই হয়নি – তাদের জন্য উপকারী হতে পারে।
