হাওড়া স্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন বৃষ্টির কারণে বহু ট্রেন বাতিল!

গত কয়েকদিন ধরেই দক্ষিণবঙ্গ ও কলকাতার বিভিন্ন জেলায় টানা বৃষ্টিপাতের জেরে জনজীবন বিপর্যস্ত। বিশেষ করে হাওড়া ও কলকাতা শহরে ভারী বর্ষণের ফলে জল জমে গিয়েছে একাধিক রাস্তায়। এর সঙ্গে বড় প্রভাব পড়েছে রেল পরিষেবায়। দেশের অন্যতম ব্যস্ততম রেলস্টেশন হাওড়া জংশন আজ সকালে থেকেই ট্রেন চলাচলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
বৃষ্টির তীব্রতা ও ট্র্যাকের উপর জল জমে যাওয়ার কারণে বহু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, আবার কিছু ট্রেন দেরিতে ছাড়ছে। অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যাত্রী — সকলের মধ্যেই দেখা দিয়েছে চরম অসুবিধা ও ক্ষোভের আবহ।
🌧️ টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত রেললাইন
আলিপুর আবহাওয়া দফতর আগেই জানিয়েছিল, দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রবল বর্ষণ হবে। সেই পূর্বাভাসই সত্যি হয়েছে। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ হাওড়া ও তার আশপাশের এলাকাগুলি প্রায় জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, হাওড়া-মেদিনীপুর, হাওড়া-বাঁকুড়া, হাওড়া-পুরুলিয়া, এমনকি হাওড়া-বর্ধমান মেইন লাইনেও ট্র্যাকে জল জমে ট্রেন চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।
রেলের এক আধিকারিক বলেন, “সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু ট্রেন আপাতত বাতিল করা হয়েছে। কিছু লোকাল ট্রেন দেরিতে ছাড়ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
🚉 কোন কোন ট্রেন বাতিল?
রেলের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার নিম্নলিখিত ট্রেনগুলি বাতিল করা হয়েছে বা সময় পরিবর্তন করা হয়েছে:
- হাওড়া–খড়গপুর লোকাল
- হাওড়া–আমতা লোকাল
- হাওড়া–বর্ধমান কর্ড লাইন লোকাল
- হাওড়া–দিঘা এক্সপ্রেস (বাতিল)
- হাওড়া–পুরী এক্সপ্রেস (সময়সূচি পরিবর্তিত)
- সাঁতরাগাছি–তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস (বাতিল)
- শালিমার–আদ্রা প্যাসেঞ্জার (আংশিকভাবে বাতিল)
যেসব যাত্রী ইতিমধ্যেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন, তাঁদের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ পূর্ণ টাকা ফেরতের ব্যবস্থা রাখছে বলে জানা গিয়েছে।
🚌 বিকল্প পরিবহনেও দুর্ভোগ
ট্রেন বন্ধ থাকায় অনেকেই হাওড়া থেকে কলকাতা বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার দিকে বাস বা ট্যাক্সি ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকায় বাস চলাচলও যথেষ্ট বাধাগ্রস্ত।
এক অফিসযাত্রী বলেন, “প্রতিদিন সকালে আমি হাওড়া থেকে শিয়ালদহ হয়ে অফিস যাই। আজ ট্রেন বন্ধ, তাই বাস ধরতে গিয়েছিলাম — কিন্তু বাসও প্রায় আসছে না। রাস্তায় জল জমে আছে, কোথাও গাড়ি আটকে আছে।”
কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, হাওড়া ব্রিজ, বিদ্যাসাগর সেতু, আলিপুর রোড, ধর্মতলা, ও এসপ্ল্যানেড এলাকায় যানজট তৈরি হয়েছে।
🧍 যাত্রীদের ভোগান্তির ছবি
হাওড়া স্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন বৃষ্টির কারণে বহু ট্রেন বাতিল!
হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সকালে থেকেই হাজার হাজার যাত্রী আটকে রয়েছেন। কেউ ট্রেনের অপেক্ষায়, কেউবা রেলকর্মীদের কাছে তথ্য জানতে ছুটছেন।
এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রেল কর্তৃপক্ষ আগে থেকে জানাতে পারত। এত বৃষ্টি হচ্ছে তিনদিন ধরে, কিন্তু হঠাৎ করে ট্রেন বাতিলের ঘোষণা শুনে বিপদে পড়েছি।”
আরেকজন বলেন, “বৃষ্টির দিনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যারা দূরপাল্লার যাত্রী। আমাদের ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে, এখন নতুন টিকিট কাটা প্রায় অসম্ভব।”
⚡ রেলের তরফে ব্যবস্থা
হাওড়া রেল ডিভিশনের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, যাত্রীদের সাহায্যের জন্য বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। স্টেশনে পর্যাপ্ত ঘোষণা ও তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
স্টেশনে অতিরিক্ত সাফাই কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে যাতে জল যত দ্রুত সম্ভব বের করা যায়। ট্র্যাক পরিষ্কার রাখার জন্য রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং টিমও কাজ করছে।
রেল আধিকারিকদের মতে, “জল কমলেই পরিষেবা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমরা প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
🌦️ আবহাওয়ার আপডেট: কবে কমবে বৃষ্টি?
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি চলবে। বিশেষ করে হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও কলকাতা জেলায় বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল।
এরপর ধীরে ধীরে মেঘ সরে গিয়ে শনিবার থেকে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া দফতর।
🏠 সাধারণ মানুষের চিন্তা
টানা বৃষ্টিতে শুধু রেল নয়, দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে। দোকানপাট বন্ধ, স্কুলে ছুটি, অফিসে উপস্থিতি কম।
হাওড়ার বেলুড়, দাশনগর, লিলুয়া, ও শিবপুর এলাকায় জল জমে ঘরে ঢুকে পড়েছে বলে খবর।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, “জল নেমে গেলে তবেই বাজারে যেতে পারব। চারপাশ কাদা ও জলে ভরা।”
বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটও ঘটছে, যা জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
📰 প্রশাসনের তৎপরতা
হাওড়া পৌরসভা ও রাজ্য প্রশাসনের তরফে জল নামানোর জন্য পাম্প চালানো হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল মোতায়েন করা হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, “আমরা ২৪ ঘণ্টা নজর রাখছি। যেসব এলাকায় জল জমেছে সেখানে অতিরিক্ত মোটর বসানো হচ্ছে।”
🧾 রেল পরিষেবা স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে?
রেল কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ট্র্যাকের জল নেমে গেলেই ধীরে ধীরে ট্রেন পরিষেবা চালু করা হবে। আপাতত লোকাল ট্রেনের তুলনায় দূরপাল্লার ট্রেনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, যাত্রীরা রেলের NTES অ্যাপ বা IRCTC ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রতিটি ট্রেনের লাইভ আপডেট দেখতে পারবেন।
📞 জরুরি তথ্য ও হেল্পলাইন নম্বর
হাওড়া ডিভিশনের তরফে নিচের হেল্পলাইন নম্বরগুলি চালু করা হয়েছে যাতে যাত্রীরা তথ্য পেতে পারেন:
- হাওড়া কন্ট্রোল রুম: 033-2638-2565
- রেল যাত্রী হেল্পলাইন (তোলফ্রি): 139
- ইমেল: howrahhelpdesk@indianrail.gov.in
⚠️ যাত্রীদের জন্য সতর্কতা
- ট্রেনে ওঠার আগে রেলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সময় দেখে নিন।
- অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজনে স্টেশনের ঘোষণাগুলি মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
- যাদের ট্রেন বাতিল হয়েছে, তারা ফেরত টিকিটের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারেন।
- জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণ করুন — না হলে আজকের দিনটিতে যাত্রা স্থগিত রাখাই ভালো।
🕰️ আজকের পরিস্থিতি সংক্ষেপে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| স্টেশন | হাওড়া জংশন |
| প্রধান কারণ | প্রবল বৃষ্টিতে ট্র্যাকে জল জমা |
| বাতিল ট্রেন সংখ্যা | প্রায় ২৫+ |
| দেরি করা ট্রেন সংখ্যা | ৩০+ |
| বিকল্প ব্যবস্থা | বাস, ট্যাক্সি, অ্যাপ ক্যাব |
| হেল্পলাইন | 139 ও 033-2638-2565 |
📍 হাওড়া স্টেশনের বর্তমান অবস্থা
দুপুর নাগাদ কিছু এলাকায় জল নামলেও হাওড়া মেইন টার্মিনাল ও দ্বিতীয় গেটের সামনে এখনও জল জমে আছে। রেল কর্মীরা পাম্পের সাহায্যে জল বের করার কাজ করছেন।
বিকেল নাগাদ কয়েকটি লোকাল ট্রেন ছাড়লেও দূরপাল্লার ট্রেনগুলি এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
🙏 যাত্রীদের অনুরোধ
রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের অনুরোধ করেছে ধৈর্য ধরতে ও ভিড় না বাড়াতে। তারা জানিয়েছে, “পরিস্থিতি দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। সকলকে নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।”
❓ FAQ (প্রশ্নোত্তর বিভাগ):
প্রশ্ন ১: কেন হাওড়া স্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে?
উত্তর: টানা বৃষ্টিতে ট্র্যাকের উপর জল জমে যাওয়ায় রেল কর্তৃপক্ষ সুরক্ষার কারণে ট্রেন বাতিল ও সময় পরিবর্তন করেছে।
প্রশ্ন ২: কোন কোন ট্রেন বাতিল করা হয়েছে?
উত্তর: হাওড়া–খড়গপুর লোকাল, হাওড়া–আমতা লোকাল, দিঘা এক্সপ্রেস, সাঁতরাগাছি–তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন বাতিল হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: যাত্রীদের জন্য কী বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: যাত্রীরা বাস বা ট্যাক্সি পরিষেবা ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বাতিল ট্রেনের টিকিটের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
প্রশ্ন ৪: রেল পরিষেবা কবে স্বাভাবিক হবে?
উত্তর: রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জল নেমে গেলেই ধীরে ধীরে পরিষেবা স্বাভাবিক করা হবে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে।
প্রশ্ন ৫: হাওড়া রেলের হেল্পলাইন নম্বর কী?
উত্তর: রেলের হেল্পলাইন নম্বর 139 এবং হাওড়া কন্ট্রোল রুমের নম্বর 033-2638-2565।
🗓️ উপসংহার
হাওড়া স্টেশনে এই ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়, কিন্তু এবারের বৃষ্টি রেকর্ড মাত্রায় হয়েছে। টানা বর্ষণে রেল পরিষেবা বিপর্যস্ত হলেও প্রশাসন ও রেল কর্মীরা দিনরাত কাজ করছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।
যাত্রীরা যদিও আজ দুর্ভোগে পড়েছেন, তবুও সবাই আশা করছেন আগামীকাল থেকে ট্রেন পরিষেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।
একটি বিষয় স্পষ্ট — প্রকৃতির সামনে মানুষের পরিকল্পনা অনেক সময়ই থমকে দাঁড়ায়।
শেষ কথা:
বৃষ্টি যেমন জীবন দেয়, তেমনি মুহূর্তে থামিয়ে দিতে পারে গোটা শহরের গতি। হাওড়ার আজকের এই অবস্থা যেন আগামী দিনের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে — আরও ভালো পরিকাঠামো, দ্রুত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের তথ্যপ্রাপ্তির সহজ ব্যবস্থা হল সময়ের দাবি।
