কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ: দুর্গাপুজো কমিটির অনুদান খরচের 100% হিসাব দিতে হবে রাজ্য সরকারকে

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ: দুর্গাপুজো কমিটির অনুদান খরচের 100% হিসাব দিতে হবে রাজ্য সরকারকে

Spread the love

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ: দুর্গাপুজো কমিটির অনুদান খরচের 100% হিসাব দিতে হবে রাজ্য সরকারকে

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ: দুর্গাপুজো কমিটির অনুদান খরচের 100% হিসাব দিতে হবে রাজ্য সরকারকে

ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এখন এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এ উৎসবে অংশ নেন। রাজ্যের প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় দুর্গাপুজো হয় এবং সরকারি দিক থেকেও বহুবার এই উৎসবকে স্বীকৃতি ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক অনুদান দিয়ে আসছে। প্রথমে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছিল, পরে সেই অঙ্ক ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার টাকায়। https://www.youtube.com/live/j9ZrYquiKlw?si=8coHbaZW1_ApUf5y

কিন্তু, এই অনুদান কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। বিরোধী দলগুলি বহুবার অভিযোগ করেছে যে সরকারি টাকা যথাযথভাবে খরচ করা হচ্ছে না বা অনুদানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে। আদালত রাজ্য সরকারকে জানিয়েছে, দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে দেওয়া অনুদান ঠিক কীভাবে খরচ হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও শপথপত্র (অ্যাফিডেভিট) আকারে আদালতে জমা দিতে হবে।

এই রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। চলুন আমরা বিস্তারিতভাবে জানি পুরো ঘটনাপ্রবাহ, আদালতের নির্দেশ, এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে।

দুর্গাপুজো কমিটিকে অনুদান: পটভূমি

অনুদানের সূচনা

২০১৯ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যের প্রতিটি দুর্গাপুজো কমিটি ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান পাবে। উদ্দেশ্য ছিল, দুর্গাপুজোর মাধ্যমে যে বিশাল সামাজিক উদ্দীপনা তৈরি হয়, তা আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হোক এবং পুজোর আয়োজকরা কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পান।

ধীরে ধীরে অনুদানের বৃদ্ধি

  • ২০২০ সালে অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয় ৫০ হাজার টাকা।

  • ২০২১ সালে কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার অনুদান চালু রাখে।

  • ২০২২ সালে অনুদান বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকা।

  • বর্তমানে প্রতিটি দুর্গাপুজো কমিটি পাচ্ছে ৭০ হাজার টাকা।

শুধু আর্থিক অনুদান নয়, এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল মকুব, পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ সহযোগিতা ইত্যাদি সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।

বিতর্কের সূত্রপাত

এই অনুদান ঘোষণার শুরু থেকেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে থাকে। প্রধান অভিযোগগুলি ছিলঃ

  1. সরকারি টাকার অপচয় – স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানের মতো খাতে খরচ না করে উৎসবে টাকা দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত?

  2. রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য – দুর্গাপুজো কমিটিগুলি অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। তাই ভোটব্যাঙ্কে নজর রেখে এই অনুদান দেওয়া হচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন ওঠে।

  3. টাকার সঠিক ব্যবহার – এত বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হলেও, তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না তা নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পর্যালোচনা বা অডিট হচ্ছিল না।

হাইকোর্টে মামলা

একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও আইনজীবী এই বিষয়ে আদালতে মামলা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, সরকারি টাকা জনগণের করের টাকা। তাই সেটি কিভাবে খরচ হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের জানার অধিকার আছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ :কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ: দুর্গাপুজো কমিটির অনুদান খরচের 100% হিসাব দিতে হবে রাজ্য সরকারকে

কলকাতা হাইকোর্ট শুনানিতে জানায় –

  • দুর্গাপুজো নিঃসন্দেহে বাংলার অন্যতম বড় উৎসব, কিন্তু সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে খরচ হচ্ছে কি না তা দেখা জরুরি।

  • জনগণের টাকা কেবলমাত্র সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের নামে দেওয়া হলে, তার হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক।

  • অনুদানের অঙ্ক যেহেতু প্রতি বছর বাড়ছে, তাই তার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট করা উচিত।

আদালতের নির্দেশ

কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে:

  1. দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে দেওয়া প্রতিটি অনুদানের বিস্তারিত তথ্য আদালতে পেশ করতে হবে।

  2. কত টাকা দেওয়া হয়েছে, কোন কোন কমিটি পেয়েছে, এবং সেই টাকা কীভাবে ব্যবহার হয়েছে তার শপথপত্র (অ্যাফিডেভিট) জমা দিতে হবে।

  3. ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতি (Policy) তৈরি করতে হবে, যাতে কোনও ধরনের দুর্নীতি বা অপব্যবহার না হয়।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দুর্গাপুজো বাংলার সংস্কৃতির অংশ, তাই সরকার এর পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা দাবি করেছেন, এই অনুদানের ফলে ছোট ছোট পুজো কমিটিগুলি অনেকটা সহায়তা পায়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে প্রস্তুত।

বিজেপি-র অবস্থান

বিজেপি শুরু থেকেই এই অনুদানের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে, সরকারি টাকা খুশি করার রাজনীতি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। আদালতের রায়ে তাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলেই দাবি করেছে বিজেপি নেতৃত্ব।

অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়া

বাম ও কংগ্রেসও একইভাবে এই অনুদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাঁদের দাবি, সরকারি তহবিল সাংস্কৃতিক উৎসবে নয়, মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যবহার হওয়া উচিত।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

এই বিষয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

  • অনেকেই বলছেন, দুর্গাপুজো আমাদের গর্বের উৎসব, তাই সরকারের সহায়তা থাকা উচিত।

  • আবার অনেকে মনে করছেন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা বা কর্মসংস্থান বাড়াতে টাকা খরচ করা অনেক বেশি প্রয়োজনীয়।

  • সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, টাকার ব্যবহার নিয়ে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তবে উৎসবের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন:

  • সরকারি টাকার প্রতিটি খরচের সঠিক হিসাব থাকা অত্যন্ত জরুরি।

  • দুর্গাপুজো অনুদান রাজ্যের অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও অবদান রাখে, কারণ এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়। তবে, সেই খরচ যদি নিয়মিতভাবে অডিট না হয়, তবে অপব্যবহার বা দুর্নীতির সম্ভাবনা থেকেই যায়।

সামনে কী হতে পারে? কলকাতা হাইকোর্ট দুর্গাপুজো অনুদান

কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশের পর রাজ্য সরকারকে বিশদ তথ্য জোগাড় করতে হবে। প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি দুর্গাপুজো কমিটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। প্রত্যেকটির অনুদান খরচের খুঁটিনাটি হিসাব দেওয়া সহজ কাজ নয়। ফলে আগামী দিনে এই প্রক্রিয়া রাজ্যের প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে আদালতের নির্দেশ ভবিষ্যতের জন্য একটি নজির তৈরি করবে। কেবল দুর্গাপুজো নয়, রাজ্যের অন্য কোনও উৎসব বা সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতেও যদি সরকারি অনুদান দেওয়া হয়, তবে তার হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।

FAQ

Q1: কলকাতা হাইকোর্ট কেন দুর্গাপুজো অনুদানের হিসাব চাইল?
Ans: আদালত মনে করেছে সরকারি টাকা জনগণের সম্পদ, তাই দুর্গাপুজো কমিটিকে দেওয়া অনুদান কীভাবে খরচ হচ্ছে তার স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

Q2: রাজ্যের কতগুলো দুর্গাপুজো কমিটি অনুদান পায়?
Ans: পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি দুর্গাপুজো কমিটি রয়েছে, যাদের প্রত্যেককে সরকার অনুদান দিয়ে থাকে।

Q3: বর্তমানে দুর্গাপুজো কমিটিকে কত টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে?
Ans: বর্তমানে প্রতিটি দুর্গাপুজো কমিটি ৭০ হাজার টাকা অনুদান পাচ্ছে।

Q4: বিরোধীরা অনুদান নিয়ে কী অভিযোগ তুলছে?
Ans: বিরোধীদের দাবি, সরকারি টাকা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনুদান খরচের সঠিক অডিট হচ্ছে না।

Q5: এই নির্দেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব কী হতে পারে?
Ans: ভবিষ্যতে কেবল দুর্গাপুজো নয়, যেকোনও সাংস্কৃতিক অনুদানের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে।

উপসংহার

দুর্গাপুজো শুধু বাংলার উৎসব নয়, এটি আজ বিশ্বজোড়া পরিচিতি লাভ করেছে। ইউনেস্কোও এটিকে ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারি সাহায্য পাওয়া একদিক থেকে যৌক্তিক। কিন্তু একইসঙ্গে, জনগণের টাকার প্রতিটি ব্যয় স্বচ্ছ ও সঠিক পথে হচ্ছে কিনা সেটি দেখাও সমানভাবে জরুরি।

কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ সেই স্বচ্ছতার পথ খুলে দিল। এখন দেখা যাক, রাজ্য সরকার কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং আগামী দিনে দুর্গাপুজো অনুদান নিয়ে বিতর্ক কতদূর গড়ায়।

এটাও দেখুন

👉ইডি হানা: তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক জীবান কৃষ্ণ সাহার বাড়িতে চাকরি দুর্নীতি মামলায় তোলপাড় বাংলার রাজনীতি

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *