বউবাজার টানেলের নতুন প্রযুক্তির ঢাল – ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় জলাবদ্ধতা রোধে একটি বড় পদক্ষেপ

বউবাজার টানেলের নতুন প্রযুক্তির ঢাল – ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় জলাবদ্ধতা রোধে একটি বড় পদক্ষেপ

Spread the love

বউবাজার টানেলের নতুন প্রযুক্তির ঢাল – ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় জলাবদ্ধতা রোধে একটি বড় পদক্ষেপ

বউবাজার টানেলের নতুন প্রযুক্তির ঢাল – ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় জলাবদ্ধতা রোধে একটি বড় পদক্ষেপ

কলকাতার মেট্রো রেল প্রকল্প বহু বছরের স্বপ্ন। শহরের ট্র্যাফিক সমস্যার সমাধান আর দ্রুত যাতায়াতের জন্য এই প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বউবাজার এলাকা। এখানকার জমি নরম, পুরোনো বাড়ি গুলি ভঙ্গুর, আর মাটির নিচে অজস্র জলধারা। ফলে মেট্রো টানেল খোঁড়ার সময় বারবার ধস নেমেছে, ভেঙেছে বহু বাড়ি, স্থানান্তরিত হয়েছে শত শত পরিবার।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দিতে মেট্রো কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন – এবার নতুন “টেক শিল্ড” প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে মাটির নীচে আর জলচুই না হয় এবং টানেল খনন নিরাপদ হয়। এই পদক্ষেপকে ঘিরে আবার নতুন করে আশার আলো দেখছে কলকাতাবাসী, বিশেষত বউবাজারের মানুষজন।

বউবাজারের সমস্যার শুরু

২০১৯ সালে প্রথম বড় ধস নামে বউবাজারে। মেট্রো টানেল বোরিং করার সময় মাটির নীচের পুরোনো জলাধার থেকে হঠাৎ জল বেরোতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক বাড়ি ফাটল ধরতে শুরু করে, কেউ ভেবে উঠতে পারছিল না কী হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল – গোটা এলাকা বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠেছে।

সেই থেকে বারবার ছোট বড় ধস নামছে। কত পরিবারকে অস্থায়ীভাবে হোটেল বা ভাড়া বাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেকের জীবনের সঞ্চয় বাড়ি-ঘর ভেঙে গিয়েছে।

মেট্রোর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আর বউবাজারের আতঙ্ক

পূর্ব-পশ্চিম মেট্রো করিডর কলকাতার সবচেয়ে বড় পরিবহণ প্রকল্প। সল্টলেক সেক্টর ফাইভ থেকে হাওড়া ময়দান – এই ১৬ কিলোমিটার পথের বেশিরভাগই টানেলের ভেতর দিয়ে যাবে। হুগলি নদীর তলা দিয়ে প্রথমবার মেট্রো যাবে। এই প্রকল্প চালু হলে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলে যাবে।

কিন্তু মাঝখানে বউবাজারে ধস নামায় কাজ প্রায় থেমে গিয়েছিল। যাত্রীদের মনে প্রশ্ন উঠেছিল – আদৌ কি এই মেট্রো সম্পূর্ণ হবে? আর যদি হয়ও, তবে কতটা নিরাপদ?

বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগ – টেক শিল্ড প্রযুক্তি

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা মেট্রো রেলের সঙ্গে যুক্ত হন। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয় – টানেলের আশেপাশে মাটিকে আরও শক্ত করার জন্য “টেক শিল্ড” প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

এই প্রযুক্তি আসলে এক ধরনের ওয়াটারপ্রুফ ব্যারিয়ার। এর ফলে মাটির নীচে থাকা ভূগর্ভস্থ জল টানেলে ঢুকতে পারবে না। পাশাপাশি, টানেলের দেওয়ালে বিশেষ কেমিক্যাল ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে যাতে ফাটল ধরা মাটি একেবারে শক্ত হয়ে যায়।

কীভাবে কাজ করবে এই টেক শিল্ড?

১. জলচুই আটকানো – টানেলের চারপাশে বিশেষ মেমব্রেন বসানো হচ্ছে, যাতে জল বেরোতে না পারে।

২. মাটি শক্ত করা – কেমিক্যাল গ্রাউটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নরম মাটিকে শক্ত কংক্রিটের মতো করে তোলা হচ্ছে।

৩. টানেলের নজরদারি – ২৪ ঘণ্টা সেন্সরের মাধ্যমে মাটির চাপ, জলস্তর ও কম্পন মাপা হচ্ছে। কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

৪. পুরোনো বাড়ির সুরক্ষা – আশেপাশের বাড়িগুলিতে ক্রমাগত ফাটল মনিটরিং চলছে। দরকার পড়লে আগে থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

বউবাজার টানেলের নতুন প্রযুক্তির ঢাল – ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় জলাবদ্ধতা রোধে একটি বড় পদক্ষেপ

বউবাজারের মানুষ গত কয়েক বছরে অনেক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। অনেকের বাড়ি চিরকালের মতো ভেঙে গেছে। তাই নতুন প্রযুক্তির কথা শুনে প্রথমে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে, এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে। এখন আর নতুন করে বড় ফাটল দেখা যাচ্ছে না। অনেকে বলছেন –

“আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, মনে হচ্ছিল আর কোনোদিন বাড়িতে ফিরতে পারব না। কিন্তু এখন আশা জাগছে যে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।”

সরকারের ভূমিকা

রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার দু’জনেই এই প্রকল্পে নজর রাখছে। কারণ এই মেট্রো শুধু কলকাতার নয়, গোটা পূর্ব ভারতের উন্নয়নের জন্য বড় পদক্ষেপ। ধসের ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে রেলমন্ত্রী – সকলেই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে, অস্থায়ী থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা

বউবাজারের ঘটনা শুধু কলকাতার জন্য নয়, সারা দেশের জন্য শিক্ষণীয়। বড় মাপের মেট্রো বা আন্ডারগ্রাউন্ড প্রকল্প করার সময় মাটির নীচের জলধারা, পুরোনো স্থাপনা, জমির প্রকৃতি – সবকিছু আগেই খুঁটিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই টেক শিল্ড প্রযুক্তি সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য শহরেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।

আশা বনাম আতঙ্ক

কলকাতার মানুষ একদিকে মেট্রো চালু হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, অন্যদিকে ধসের আতঙ্কে ভুগছেন। তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন আর বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা দিয়ে এবার মনে হচ্ছে – শেষমেশ এই প্রকল্প সফল হবে।

বউবাজার টানেলে টেক শিল্ড প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু একটি ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্যোগ নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের প্রতীক।

FAQ

প্রশ্ন ১: বউবাজার টানেলে কেন ধস নেমেছিল?

উত্তর: টানেল খোঁড়ার সময় ভূগর্ভস্থ জল বেরিয়ে এসে মাটি নরম করে দেয়। ফলে বাড়িঘরে ফাটল ধরে এবং ধস নামে।

প্রশ্ন ২: টেক শিল্ড প্রযুক্তি কী?

উত্তর: এটি এক ধরনের জলরোধক ব্যারিয়ার। এর মাধ্যমে মাটির নীচের জল টানেলে ঢুকতে পারে না এবং আশেপাশের মাটি শক্ত করা যায়।

প্রশ্ন ৩: এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কী উপকার হবে?

উত্তর: জলচুই বন্ধ হবে, মাটি শক্ত হবে, ধসের সম্ভাবনা কমবে এবং বাড়িঘর ও টানেল সুরক্ষিত থাকবে।

প্রশ্ন ৪: বউবাজারের মানুষদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে?

উত্তর: বাড়িঘরগুলিতে নিয়মিত ফাটল মনিটরিং করা হচ্ছে, প্রয়োজনে মানুষদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন ৫: এই প্রযুক্তি কি ভারতের অন্য শহরেও ব্যবহার করা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যদি এটি সফল হয় তবে ভবিষ্যতে ভারতের অন্য মেট্রো প্রকল্পেও টেক শিল্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

উপসংহার

বউবাজারের ধসপ্রবণ এলাকা আজ নতুন করে সুরক্ষিত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে। টানেলের ভেতরে টেক শিল্ড বসানো, জলচুই আটকানো, মাটি শক্ত করা – সব মিলিয়ে বড় আশার বার্তা দিচ্ছে।

কলকাতার স্বপ্নের পূর্ব-পশ্চিম মেট্রো যদি সত্যিই সাফল্যের সঙ্গে চালু হয়, তবে এই বউবাজার অধ্যায় হয়ে থাকবে শিক্ষা, সতর্কতা আর প্রযুক্তির জয়ের ইতিহাস।

এটাও দেখুন

👉 পূর্ব-পশ্চিম মেট্রোর 2025 এর নতুন অধ্যায়: ভিড়েই বোঝা গেল ভবিষ্যতের ছবি