কলকাতা আবারও রাজনৈতিক ঝড়ের কেন্দ্রে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার মধ্যেই এবার জন্ম-শংসাপত্র ইস্যু নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছেন, কলকাতা পুরসভা “বেআইনি ও অনৈতিক উপায়ে গণহারে জন্ম শংসাপত্র বিলি করছে”—যা প্রকৃত নাগরিকদের জন্য নয়, বরং সন্দেহভাজন কিছু ব্যক্তির জন্য, যারা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।

শুভেন্দুর বিস্ফোরক অভিযোগ: কমিশনারকে সরাসরি চিঠি
বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর ২০২৫) শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা পুরসভার কমিশনার সুমিত গুপ্তকে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন,
“এটি আসলে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা।”
শুভেন্দুর দাবি, জন্ম শংসাপত্র একটি আইনি নথি যা সাধারণত নবজাতকদের দেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা পুরসভা বিপুল সংখ্যায় এই নথি ইস্যু করছে—যা অস্বাভাবিক। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা রাজনৈতিক স্বার্থে জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
শুভেন্দুর দাবি করা চারটি তথ্য
বিরোধী দলনেতা তাঁর চিঠিতে কমিশনারের কাছে চারটি নির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছেন—
-
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত মোট কতগুলি জন্ম শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে।
-
পুরসভা এলাকার বাইরে বসবাসকারীদের মধ্যে কতজন শংসাপত্র পেয়েছেন।
-
বিলম্বিত নিবন্ধনের সংখ্যা—বিশেষত ২০০৭ সালের আগে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।
-
এই সময়কালে নবজাতকদের কতটি শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এই তথ্যগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করলেই বোঝা যাবে যে সত্যিই কি কোনও অসাধু উদ্দেশ্যে “বাল্ক ইস্যু” চলছে কিনা।
আইনি সতর্কবার্তা ও আরটিআই আবেদন
শুভেন্দু অধিকারী শুধু অভিযোগেই থেমে থাকেননি। তিনি জানিয়েছেন যে তিনি ইতিমধ্যেই তথ্য জানার অধিকার আইন (RTI) অনুযায়ী কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরে আবেদন করেছেন। তিনি চান, গত ৩০ দিনে কতগুলি জন্ম শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সেই সংখ্যা কত বৃদ্ধি পেয়েছে—তা প্রকাশ করা হোক।
তাঁর হুঁশিয়ারি,
“জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ১৯৬৯-এর নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আমি নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে অনুরোধ করব, যেন এই অনিয়মের অবিলম্বে তদন্ত হয়।”
তৃণমূলের পাল্টা জবাব: “ভিত্তিহীন অভিযোগ”
অন্যদিকে, তৃণমূল পরিচালিত কলকাতা পুরসভা শুভেন্দুর অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছে। মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) স্বপন সমাদ্দার বলেন,
“কলকাতা পুরসভা থেকে জন্ম-শংসাপত্র পাওয়ার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বৈধ নথিপত্র জমা দিলে তবেই শংসাপত্র দেওয়া হয়। বিরোধী দলনেতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
তিনি আরও যোগ করেন,
“শুভেন্দু অধিকারী নিজের মতো করে সকলকেই সন্দেহ করেন। কিন্তু আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, পুরসভা আইন মেনেই কাজ করে, কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়।”
এসআইআর প্রক্রিয়া কী?
“বিশেষ নিবিড় সংশোধন” বা SIR (Special Intensive Revision) হল নির্বাচন কমিশনের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা আপডেট ও শুদ্ধ করা হয়। এ সময় পুরোনো, মৃত বা অনুপস্থিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয় এবং নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করা হয়।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের ১১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একযোগে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিশনের বুথ-স্তরের আধিকারিকেরা (BLO) প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে যাচাই করছেন ভোটার তালিকার তথ্য।
এই সময়ে জন্ম শংসাপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি, কারণ এটি নাগরিকত্ব ও জন্ম-তারিখের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। আর তাই শুভেন্দুর দাবি, এই সময়েই জন্ম শংসাপত্রের “অস্বাভাবিক বৃদ্ধি” সন্দেহজনক।
শুভেন্দুর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট: সরাসরি ট্যাগ কমিশনকে
এই বিষয়ে শুভেন্দু তাঁর এক্স (পূর্বে টুইটার) অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি ট্যাগ করেন—
-
Election Commission of India (ECI)
-
Chief Electoral Officer, West Bengal
-
Union Home Ministry
তাঁর পোস্টে তিনি লেখেন,
“কলকাতা পুরসভা বেআইনি ভাবে জন্ম শংসাপত্র ইস্যু করছে, যা ভোটার তালিকা প্রভাবিত করতে পারে। আমি অবিলম্বে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি
এই অভিযোগ ঘিরে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। তৃণমূলের একাংশ বলছে, এটি বিরোধীদের “রাজনৈতিক নাটক”, যেখানে প্রশাসনকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব শুভেন্দুর পক্ষে সুর চড়িয়েছেন।
বিজেপি নেতা অগ্নিমিত্রা পল বলেন,
“শুভেন্দু অধিকারী যেটা বলেছেন, তা একদম ঠিক। পুরসভা এখন ভোটব্যাঙ্ক বাঁচানোর যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।”
অন্যদিকে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ মন্তব্য করেন,
“বিজেপির কাছে কোনও ইস্যু নেই, তাই পুরসভার নিয়মতান্ত্রিক কাজ নিয়েও তারা নাটক করছে।”
জন্ম শংসাপত্র ইস্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
শুভেন্দু যেভাবে RTI মাধ্যমে তথ্য চেয়েছেন, তা প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করেছে। পুরসভা সূত্রের মতে, গত এক মাসে প্রায় ২৫,০০০ জন্ম শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় ৩ গুণ বেশি। যদিও পুরসভা বলছে, “বিলম্বিত আবেদন” বাড়ায় এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে বিরোধী দলনেতার দাবি, “এই বিলম্বিত আবেদনগুলির অধিকাংশই ২০০৭ সালের আগে জন্মগ্রহণকারীদের নামে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।”
নাগরিকদের উদ্বেগ
এই ঘটনার পর অনেক নাগরিকই বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ মনে করছেন, প্রশাসন হয়তো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, সত্যিই যদি কারচুপি হয়, তাহলে প্রকৃত নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।
কলকাতার এক বাসিন্দা অরিন্দম চক্রবর্তী বলেন,
“যদি জন্ম শংসাপত্র বেআইনি ভাবে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যা হতে পারে। সরকারের উচিত সব আবেদন যাচাই করা।”
সম্ভাব্য তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
যদি শুভেন্দুর দাবি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্যের ভোটার তালিকাকে প্রভাবিত করতে পারে। সূত্রের খবর, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ইতিমধ্যেই পুরসভার কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য চেয়েছেন।
তাছাড়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকেও রিপোর্ট তলব হতে পারে, কারণ বিষয়টি “নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয়” সম্পর্কিত।
ভোটার তালিকা সংশোধনের গুরুত্ব
এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হল—
-
মৃত বা অনুপস্থিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া।
-
নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করা।
-
ভুল বানান বা ঠিকানার সংশোধন।
এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখতে নির্বাচন কমিশন একাধিক সতর্কতা জারি করেছে। কিন্তু যদি জন্ম শংসাপত্র বেআইনি ভাবে তৈরি হয়, তাহলে তা সরাসরি ভোটার তালিকায় প্রভাব ফেলতে পারে।
জন্ম শংসাপত্র: একটি আইনি নথির গুরুত্ব
জন্ম শংসাপত্র শুধু নাগরিকত্ব নয়, স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড, এমনকি প্যান ও আধার তৈরিতেও প্রয়োজনীয় নথি। তাই এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে প্রশাসনের ওপর আস্থা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
“জন্ম শংসাপত্রের বেআইনি ইস্যু শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক ইস্যু না প্রশাসনিক ব্যর্থতা?
এই ঘটনাকে কেউ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখছেন, কেউ প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে। শুভেন্দুর অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে এটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি। আবার যদি অভিযোগ প্রমাণহীন হয়, তবে এটি পুরসভার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপপ্রচার হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“এটি এমন এক সময় এসেছে, যখন এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। তাই অভিযোগের গুরুত্ব অনেক। প্রশাসনের উচিত দ্রুত স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা।”

উপসংহার: স্বচ্ছ তদন্তই এখন দাবি
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের আস্থা রক্ষার একমাত্র উপায়—স্বচ্ছ তদন্ত। শুভেন্দুর দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ন, তেমনি পুরসভার জবাবও বিবেচনাযোগ্য।
যদি সত্যিই বেআইনি জন্ম শংসাপত্র ইস্যু হয়ে থাকে, তবে তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে বিরোধীদেরও উচিত প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ থেকে বিরত থাকা।
সারসংক্ষেপ (Quick Summary)
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| অভিযোগকারী | শুভেন্দু অধিকারী |
| অভিযুক্ত সংস্থা | কলকাতা পুরসভা |
| অভিযোগ | বেআইনি জন্ম শংসাপত্র বিতরণ |
| সময়কাল | ৬ অক্টোবর – ৫ নভেম্বর ২০২৫ |
| মূল ইস্যু | এসআইআর (ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়া চলাকালীন অসাধু কার্যকলাপ |
| পুরসভার জবাব | অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত |
| সম্ভাব্য তদন্তকারী সংস্থা | নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক |
শেষ কথা:
কলকাতার এই “জন্ম শংসাপত্র বিতর্ক” এখন রাজ্য রাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে শুভেন্দুর অভিযোগ, অন্যদিকে পুরসভার অস্বীকৃতি—দুই পক্ষের টানাপোড়েনে জনমনে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন:
“আসলেই কি কলকাতা পুরসভা বেআইনি ভাবে জন্ম শংসাপত্র দিচ্ছে, নাকি এটি নিছক রাজনৈতিক প্রচার?”
সময়ই বলবে সত্যিটা, তবে আপাতত এই বিতর্কই আলোচনার কেন্দ্রে রাজ্যের রাজনীতি।
আরও পড়ুন :
Maharashtra Voter List 2025 প্রকাশিত! নাম চেক করুন ও ভোটার আইডি কার্ড ডাউনলোড করুন মাত্র ২ মিনিটে!

[…] […]