তৃতীয় দিনে দু’কোটির বেশি এনুমারেশন ফর্ম বিলি করলেন বিএলওরা, এজেন্টও বৃদ্ধি প্রায় সব দলের! এগিয়ে গেল কারা?
রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ৪ অক্টোবর থেকে। প্রথম তিন দিনেই রাজ্যজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ কাজ করেছেন বুথ স্তরের আধিকারিকেরা (BLO)। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত প্রায় ২.০১ কোটি এনুমারেশন ফর্ম বিলি হয়েছে ভোটারদের মধ্যে। সেই সঙ্গে বেড়েছে প্রায় সব দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA) সংখ্যা — যার মধ্যে বিজেপি এখনও শীর্ষে, আর তার পিছনেই তৃণমূল কংগ্রেস।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম বিলি করছেন বিএলওরা
প্রতিটি নির্বাচনী বুথে নিয়োজিত বুথ লেভেল অফিসার (BLO) বা বুথ স্তরের আধিকারিকেরা এখন প্রায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের দায়িত্ব শুধু ভোটারদের কাছে এনুমারেশন ফর্ম বিলি করা নয়, বরং সেই তথ্য নির্বাচন কমিশনের অ্যাপে আপলোড করা।
প্রতিটি ভোটার পরিবারের কাছে গিয়ে তাঁরা যাচাই করছেন — নাম, ঠিকানা, বয়স, ভোটার আইডি নম্বর সঠিক আছে কিনা। নতুন ভোটারদের ফর্ম পূরণেও সাহায্য করা হচ্ছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তিন দিনের মধ্যেই রাজ্যজুড়ে দু’কোটির বেশি এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ হয়েছে। এটি রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের ইতিহাসে অন্যতম বড় উদ্যোগ বলে মনে করছেন কমিশনের আধিকারিকেরা।
তৃতীয় দিনে রেকর্ড — ২.০১ কোটি ফর্ম বিলি
নির্বাচন কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) রাত ৮টা পর্যন্ত রাজ্যের মোট ২.০১ কোটি এনুমারেশন ফর্ম বিলি হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৭ লক্ষেরও বেশি ফর্ম বিলি করা হচ্ছে।
এই সংখ্যা শুধু বিএলওদের কাজের গতি নয়, বরং রাজ্যের ভোটারদের অংশগ্রহণের আগ্রহও তুলে ধরছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর জানিয়েছে,
“যেভাবে প্রতিদিন ফর্ম বিলি ও পূরণের হার বাড়ছে, তা দেখে আমরা আশাবাদী যে এবারের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া সময়ের অনেক আগেই সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে।”
অনলাইনে ফর্ম পূরণের সুবিধা — এবার বাড়ি বসেই হোক এনুমারেশন
যাঁরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন বা সময়ের অভাবে বিএলওদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছেন না, তাঁদের জন্যও রয়েছে বড় সুবিধা। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে এবার অনলাইনে এনুমারেশন ফর্ম পূরণের ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
ভোটাররা চাইলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে অথবা কমিশনের নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে ফর্ম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন।
প্রথম দিন (মঙ্গলবার) থেকেই অনলাইন সিস্টেম চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তা বিলম্বিত হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অনলাইন পোর্টাল চালু হয়েছে।
কোন কোন ফর্ম বিলি হচ্ছে ভোটারদের মধ্যে?
তৃতীয় দিনে রেকর্ড! রাজ্যে দু’কোটির বেশি এনুমারেশন ফর্ম বিলি, এজেন্টের সংখ্যায় এগিয়ে বিজেপি, পাল্লা দিচ্ছে তৃণমূল
বিএলওরা এখন মূলত চার ধরনের ফর্ম নিয়ে কাজ করছেন —
-
Form 6 – নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য
-
Form 7 – মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য
-
Form 8 – নাম, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য
-
Form 8A – একই নির্বাচনী এলাকায় এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় স্থানান্তরের জন্য
এই চারটি ফর্মই ভোটার তালিকার আপডেট ও সঠিকতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ফর্ম পূরণের পর বিএলওরা তা যাচাই করে কমিশনের অ্যাপে আপলোড করছেন।
বিএলও ও বিএলএ — কারা কী কাজ করছেন?
BLO (Booth Level Officer) – ভোটার তালিকা আপডেটের মূল দায়িত্ব তাঁদের উপর।
তাঁরাই ভোটারদের বাড়ি গিয়ে ফর্ম দেন, যাচাই করেন, এবং পরে অনলাইনে তথ্য আপলোড করেন।
BLA (Booth Level Agent) – রাজনৈতিক দলগুলির নিযুক্ত প্রতিনিধিরা।
তাঁদের দায়িত্ব, বিএলওদের সঙ্গে থেকে ভোটারদের ফর্ম পূরণে সহায়তা করা এবং তাঁদের দলের পক্ষে ভোটার তালিকার সঠিকতা পর্যবেক্ষণ করা।
তৃতীয় দিনের শেষে কোন দল এগিয়ে?
কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৃতীয় দিন পর্যন্ত বিভিন্ন দলের বুথ লেভেল এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে —
| দল | এজেন্ট সংখ্যা |
|---|---|
| বিজেপি | ৩৭,৭০০ |
| তৃণমূল কংগ্রেস | ৩৫,৩৬৪ |
| সিপিএম | ২৯,১৬০ |
| কংগ্রেস | ৬,৯৯৯ |
| ফরওয়ার্ড ব্লক | ১,২২৫ |
মাত্র একদিনেই তৃণমূলের এজেন্ট সংখ্যা ২৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার-এ বেড়েছে — প্রায় ৮ হাজারের বৃদ্ধি!
বিজেপিও গত দুই দিনে প্রায় ৩ হাজার নতুন এজেন্ট নিয়োগ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলগুলির সংগঠনগত প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া
এই রেকর্ড সংখ্যক ফর্ম বিলি ও এজেন্ট বৃদ্ধির পর বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন।
তৃণমূল মুখপাত্র বলেছেন —
“আমাদের সংগঠন তৃণমূল স্তরে অনেক শক্তিশালী। বিএলএ-রা ভোটারদের সাহায্য করছেন যাতে কেউ বাদ না পড়ে।”
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে —
“বিজেপি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকে। আমাদের এজেন্টরাই নিশ্চিন্ত করছেন যাতে প্রত্যেক ভোটার সঠিকভাবে তালিকায় নাম তুলতে পারেন।”
সিপিএমের এক নেতা বলেছেন,
“এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়। আমরা সব বুথে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছি।”
প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুনত্ব
আগে এনুমারেশন প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ কাগজভিত্তিক। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো কমিশনের ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে ফর্ম আপলোডের ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এর ফলে ডেটা এন্ট্রি ত্রুটি অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
BLOরা এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই —
-
ভোটারের তথ্য যাচাই,
-
ছবি আপলোড,
-
ফর্ম স্ট্যাটাস আপডেট,
সব কিছু এক জায়গায় করতে পারছেন।
কমিশনের বার্তা — সময়সীমার আগে শেষ করতে হবে কাজ
কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এরপর শুরু হবে পর্যালোচনা ও যাচাই প্রক্রিয়া।
কমিশনের এক আধিকারিক বলেছেন —
“আমরা চাইছি, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষ করা হোক। যাতে ডিসেম্বরের শুরুতেই যাচাইয়ের কাজ শুরু করা যায়।”
গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
| ধাপ | তারিখ |
|---|---|
| এনুমারেশন শুরু | ৪ অক্টোবর ২০২৫ |
| অনলাইন ফর্ম শুরু | ৬ অক্টোবর ২০২৫ |
| এনুমারেশন শেষ | ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ |
| চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ | জানুয়ারি ২০২৬ |
সাধারণ ভোটারদের জন্য নির্দেশিকা
ভোটারদের জন্য কমিশন কিছু সহজ নির্দেশ দিয়েছে —
-
ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা যাচাই করুন ceowestbengal.nic.in ওয়েবসাইটে গিয়ে।
-
যদি নাম না থাকে, তাহলে Form 6 পূরণ করুন।
-
নাম বা ঠিকানা ভুল থাকলে Form 8 ব্যবহার করুন।
-
মৃত বা স্থানান্তরিত ব্যক্তির নাম বাদ দিতে Form 7 দিন।
-
অনলাইন আবেদন করার সময় অবশ্যই ভোটার আইডির স্ক্যান কপি ও ঠিকানার প্রমাণপত্র যুক্ত করুন।
ফর্ম পূরণে সমস্যায় কী করবেন?
যদি কেউ ফর্ম পূরণের সময় সমস্যা অনুভব করেন —
-
নিকটবর্তী বিএলও অফিসে যোগাযোগ করুন,
-
অথবা স্থানীয় বুথ লেভেল এজেন্টের সাহায্য নিন,
-
অনলাইন সহায়তার জন্য কমিশনের হেল্পলাইন নম্বরও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অনলাইন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও গতি
অনলাইন ফর্ম জমা দেওয়ার ফলে এবার অনেকটাই স্বচ্ছতা এসেছে। যাঁরা বাইরে থাকেন বা অন্য শহরে কর্মরত, তাঁরা সহজেই ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম সংশোধন করতে পারবেন।
কমিশন আশা করছে, এর ফলে ভোটার অংশগ্রহণ বাড়বে এবং ভুল বা জাল নামের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব
রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির সূচনা।
যে দল যত সক্রিয়ভাবে বিএলও ও বিএলএ নিয়োগ করছে, তাদের ভোটার বেস সংগঠিত করার প্রচেষ্টা ততই পরিষ্কার হচ্ছে।
বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সিপিএম ও কংগ্রেসও পিছিয়ে থাকতে চায় না, তাই তারাও বাড়াচ্ছে নিজেদের এজেন্ট সংখ্যা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কমিশন জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে প্রতিটি জেলার বিএলওদের সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক হবে। তাতে কাজের অগ্রগতি, ফর্ম আপলোডের হার এবং অনলাইন আবেদন সংখ্যা বিশ্লেষণ করা হবে।
সেই সঙ্গে AI-ভিত্তিক যাচাই প্রক্রিয়া চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে একই নাম একাধিক জায়গায় থেকে বাদ দেওয়া যায়।
উপসংহার
তিন দিনের মধ্যেই রাজ্যে দু’কোটির বেশি এনুমারেশন ফর্ম বিলি — নিঃসন্দেহে এক বিশাল সাফল্য।
একদিকে যেমন ভোটার তালিকা সংশোধনের গতি বেড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলির মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে এজেন্ট সংখ্যার দৌড় এখন রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে সব শেষে লক্ষ্য একটাই — “প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের নাম যেন ভোটার তালিকায় থাকে।”
এই লক্ষ্য নিয়েই এখন এগোচ্ছে রাজ্যের বিএলওরা, হাতে নিয়ে এনুমারেশন ফর্ম, ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাড়ি বাড়ি — আগামী নির্বাচনের গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্ত করার আশায়।
আরও পড়ুন :
SIR এর ফাঁদে জন্ম শংসাপত্র কেলেঙ্কারি?শুভেন্দুর বিস্ফোরক অভিযোগ
