বেলুড় মঠে কুমারী পূজা 2025 – শুভ সময় ইতিহাস ও তাৎপর্য

ভূমিকা
বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে বেলুড় মঠ এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। গঙ্গার তীরে, হাওড়ার বেলুড় অঞ্চলে অবস্থিত এই মঠ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং এটি এক আধ্যাত্মিক আলয়। স্বামী বিবেকানন্দ নিজ হাতে এই মঠ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে। প্রতি বছর দুর্গাপূজার অষ্টমীতে এখানে এক বিশেষ আচার পালিত হয়—সেটি হলো কুমারী পূজা।
অনেকেই জানতে চান – বেলুড় মঠে কুমারী পূজার শুভ সময় কখন? কীভাবে এটি সম্পন্ন হয়? আর এর তাৎপর্য কী? আসুন ধাপে ধাপে সবটা জানি।
বেলুড় মঠের ইতিহাস সংক্ষেপে
বেলুড় মঠের প্রতিষ্ঠা করেন স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে। তিনি চেয়েছিলেন এক এমন স্থান গড়ে তুলতে, যেখানে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার সব ধারাকে মিলিত করা যায়। মঠের মন্দিরের স্থাপত্যে দেখা যায় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম—সব ধর্মের প্রতীক।
দুর্গাপূজা এখানে প্রথম শুরু হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের সময়েই। তিনি মনে করতেন, দেবী দুর্গা কেবল প্রতীকী রূপে নয়, নারীত্বের শক্তির মধ্যেও বিরাজমান। তাই কুমারী পূজার প্রচলনও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছিলেন।
কুমারী পূজা কী?
কুমারী পূজা হলো এক প্রাচীন আচার যেখানে অল্পবয়সী কন্যাকে দেবী দুর্গার প্রতিরূপ বলে পূজা করা হয়। এই কন্যাকে বলা হয় ‘জগজ্জননী’র প্রতীক।
-
সাধারণত ৬ থেকে ১২ বছরের মধ্যে কুমারী বেছে নেওয়া হয়।
-
পূজার জন্য নির্বাচিত কন্যাকে দেবীর রূপে সাজানো হয়।
-
তাঁকে পূজা, আরতি, প্রসাদ দেওয়া হয়।
-
ভক্তরা তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।
এতে বিশ্বাস করা হয় যে, নিষ্পাপ, নির্মল কুমারী হৃদয়ে দেবী স্বয়ং অবতীর্ণ হন।
বেলুড় মঠে কুমারী পূজার বিশেষতা
অন্যান্য জায়গায় কুমারী পূজা হলেও বেলুড় মঠে এর আলাদা মাহাত্ম্য আছে।
-
এখানে পূজার নিয়ম খুবই শাস্ত্রসম্মত ও গম্ভীরভাবে পালিত হয়।
-
হাজার হাজার মানুষ এই দিন বেলুড় মঠে সমবেত হন।
-
মঠের সন্ন্যাসীরা নিজে হাতে এই আচার সম্পন্ন করেন।
-
ভক্তরা নীরবে দূর থেকে পূজা দর্শন করেন।
এখানকার পূজা মূলত স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারা ও শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শকে কেন্দ্র করে পালিত হয়।
কুমারী পূজার শুভ সময়
এখন আসল প্রশ্ন – বেলুড় মঠে কুমারী পূজার শুভ সময় কখন হয়?
-
দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে, অর্থাৎ মহাষ্টমীতে এই পূজা হয়।
-
সকাল থেকে পূজা শুরু হলেও, কুমারী পূজার মূল সময় হলো বেলা ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে (প্রতি বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী সময় কিছুটা পরিবর্তিত হয়)।
-
এই সময়কে ‘অষ্টমীর মধ্যাহ্নকালীন শুভ সময়’ বলা হয়।
ভক্তরা ভোর থেকেই মঠে ভিড় করেন যেন সঠিক সময়ে কুমারী পূজা দর্শন করতে পারেন।
পূজার ধাপে ধাপে বর্ণনা
বেলুড় মঠে কুমারী পূজা 2025 – শুভ সময় ইতিহাস ও তাৎপর্য
১. কুমারী নির্বাচন – আগের দিনেই মঠ কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট নিয়মে কুমারী নির্বাচন করেন।
২. স্নান ও শুদ্ধি – পূজার দিন সকালে তাঁকে স্নান করানো হয় ও বিশেষভাবে সাজানো হয়।
3. আসনগ্রহণ – কুমারীকে পূজামণ্ডপে বসানো হয়।
৪. আচার শুরু – মন্ত্রপাঠ, ধূপ-দীপ জ্বালানো, পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়।
৫. ভোগ নিবেদন – ফল, মিষ্টি, নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
৬. আরতি ও প্রণাম – সন্ন্যাসীরা আরতি করেন, ভক্তরা দূর থেকে প্রণাম করেন।
৭. আশীর্বাদ গ্রহণ – শেষে ভক্তরা কুমারীর আশীর্বাদ নেন।
ভক্তদের অনুভূতি
যাঁরা বেলুড় মঠে কুমারী পূজা দেখেছেন, তাঁরা বলেন—
-
এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে।
-
মনে হয় যেন সত্যিই দেবী মূর্ত হয়ে এসেছেন।
-
ভিড় থাকলেও শৃঙ্খলা ও নীরবতা বজায় থাকে।
অনেক ভক্তের বিশ্বাস, একবার কুমারী পূজা দর্শন করলে বছরের সব বাধা দূর হয়।
কুমারী পূজার তাৎপর্য
কুমারী পূজার আসল বার্তা হলো—
-
নারী শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা
-
নিষ্পাপতার মধ্যে ঈশ্বর দর্শন
-
সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন – “যদি তুমি প্রকৃত অর্থে ঈশ্বরকে দেখতে চাও, তবে নারীকে মা রূপে পূজা কর।”
ভ্রমণ নির্দেশিকা – কীভাবে বেলুড় মঠে যাবেন?
-
ট্রেন – হাওড়া থেকে বেলুড় স্টেশন। সেখান থেকে অটো বা টোটোতে মঠে পৌঁছনো যায়।
-
বাস – কলকাতা ও হাওড়া থেকে সরাসরি বেলুড়মঠগামী বাস পাওয়া যায়।
-
ফেরি – দমদম, দাক্ষিণেশ্বর ইত্যাদি থেকে গঙ্গার জলপথে ফেরি আছে।
অষ্টমীর দিন প্রচুর ভিড় হয়, তাই আগেভাগে পৌঁছনো ভালো।
দর্শনার্থীদের জন্য কিছু পরামর্শ
-
সকাল সকাল মঠে পৌঁছনো উচিত।
-
ভিড় সামলাতে ধৈর্য রাখা দরকার।
-
মোবাইল দিয়ে ছবি তোলার অনুমতি নেই।
-
নীরবতা বজায় রাখতে হবে।
-
কুমারী পূজার সময় ভক্তরা দূর থেকে দর্শন করবেন।
কুমারী পূজার প্রভাব সমাজে
আজকের দিনে যখন সমাজে নারী নির্যাতন, বৈষম্য বাড়ছে, তখন কুমারী পূজার আসল শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় –
-
নারীকে মা হিসেবে সম্মান করতে হবে।
-
প্রত্যেক শিশুর মধ্যে দেবী শক্তি আছে।
-
কন্যাশিশুর যত্ন ও শিক্ষা সমাজের উন্নতির মূল।
FAQ
Q1: বেলুড় মঠে কুমারী পূজা কবে হয়?
👉 দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে, অর্থাৎ মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা হয়।
Q2: বেলুড় মঠে কুমারী পূজার শুভ সময় কখন?
👉 সাধারণত সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে কুমারী পূজা হয়। তবে প্রতি বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী সময় সামান্য পরিবর্তিত হয়।
Q3: কুমারী পূজার বিশেষ তাৎপর্য কী?
👉 এটি নারীশক্তির পূজা। নিষ্পাপ কন্যাশিশুর মধ্যে দেবী দুর্গার রূপকে সম্মান জানানোই এর আসল বার্তা।
Q4: বেলুড় মঠে কুমারী পূজা কীভাবে দেখা যায়?
👉 দর্শনার্থীরা সকাল থেকে মঠে আসতে পারেন। কুমারী পূজা দূর থেকে দর্শন করা যায়। মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা নিষিদ্ধ।
Q5: বেলুড় মঠে যাওয়ার উপায় কী?
👉 হাওড়া থেকে ট্রেন, বাস বা গঙ্গার ফেরি দিয়ে সহজেই বেলুড় মঠে পৌঁছানো যায়।
উপসংহার
বেলুড় মঠে কুমারী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি হলো নারীশক্তির পূজার এক মহৎ উপলক্ষ। প্রতি বছর দুর্গাপূজার অষ্টমীতে যখন সকালবেলায় মঠের প্রাঙ্গণে হাজারো ভক্ত একসাথে প্রণাম জানান, তখন মনে হয় সত্যিই দেবী স্বয়ং অবতীর্ণ হয়েছেন।
যাঁরা এখনও এই পূজা প্রত্যক্ষ করেননি, অন্তত একবার জীবনে অবশ্যই বেলুড় মঠে কুমারী পূজা দর্শন করা উচিত। সেই শুভ সময়, সেই মুহূর্ত ভোলার নয়।
