কালীপুজো হোক বা দুর্গাপুজো, বাঙালির জীবনে পুজো মানেই আনন্দ, আড্ডা, আলো আর শিল্পের উৎসব। প্রতিটি বছর পুজোর সময় সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে অসংখ্য ক্লাব নতুন নতুন থিম নিয়ে হাজির হয়। কালীঘাট থেকে শুরু করে শোভাবাজার, বাগবাজার থেকে কুমোরটুলি—সব জায়গাতেই প্যান্ডেলগুলো দর্শকদের কাছে এক একটিকে শিল্পকর্মের মতো। তবে সাম্প্রতিক কালে নদীয়া জেলার ক্যাল্যাণী শহরও এই পুজো প্যান্ডেলের দুনিয়ায় নিজের এক বিশেষ জায়গা তৈরি করে ফেলেছে।

২০২৫ সালে ক্যাল্যাণী ITI মোড় লুমিনাস ক্লাব আবারও দর্শকদের চমকে দিতে চলেছে এক অভিনব থিম নিয়ে। এ বছরের থিম “মায়ানমারের স্বপ্নিল প্যাগোডা”। অর্থাৎ, দূর মায়ানমারের (পূর্বে বার্মা নামে পরিচিত) বিখ্যাত সোনালি প্যাগোডা এবং বৌদ্ধ স্থাপত্যকে এ বছর ক্যাল্যাণীর প্যান্ডেলে জীবন্ত করে তুলতে চলেছে ক্লাব।
এবার আমরা বিস্তারিতভাবে জানব –
-
প্যান্ডেলের ইতিহাস
-
থিম নির্বাচনের কারণ
-
মায়ানমারের প্যাগোডার বিশেষত্ব
-
প্যান্ডেল ও প্রতিমার নকশা
-
আলোকসজ্জা, সাউন্ড ও বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার
-
স্থানীয় মানুষের ভূমিকা
-
দর্শনার্থীদের আকর্ষণ
-
ক্যাল্যাণী শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়
-
এবং ভবিষ্যতের বার্তা।
ক্যাল্যাণী ITI মোড় লুমিনাস ক্লাব – এক সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ক্যাল্যাণী ITI মোড় লুমিনাস ক্লাব গত এক দশক ধরে নিয়মিত দুর্গাপুজো এবং কালীপুজো আয়োজন করে আসছে। প্রতি বছরই ক্লাব তাদের প্যান্ডেল থিমের জন্য সারা রাজ্যে আলোচনায় থাকে।
-
২০২২ সালে তাদের থিম ছিল “আয়ুর্বেদের মহিমা”।
-
২০২৩ সালে তারা করেছিল “বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন” থিম।
-
২০২৪ সালে ছিল “বৈষ্ণব পদাবলী ও নবদ্বীপের মন্দির”।
এবছর অর্থাৎ ২০২৫-এ তারা নজর ঘুরিয়েছে বিদেশের দিকে। প্রথমবারের মতো ক্যাল্যাণীর কোনো ক্লাব মায়ানমারের স্থাপত্যকে তুলে ধরছে।
কেন মায়ানমারের প্যাগোডা?
মায়ানমার বহুদিন ধরে তার প্যাগোডা ও বৌদ্ধ মঠের জন্য বিখ্যাত। শ্বেডাগোন প্যাগোডা, বাগান শহরের অসংখ্য প্যাগোডা কিংবা হসিনবিউমে প্যাগোডা—সবকটিই সোনালি রঙে মোড়া, আকাশছোঁয়া গম্বুজ ও সূক্ষ্ম খোদাই কাজের জন্য পরিচিত।
ক্লাবের সম্পাদক জানিয়েছেন, তারা এবার এমন একটি থিম চেয়েছিলেন যেটি একদিকে আধ্যাত্মিক শান্তির বার্তা দেবে, অন্যদিকে শিল্প ও স্থাপত্যের এক ভিন্ন সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলবে। সেই কারণেই বেছে নেওয়া হয়েছে মায়ানমারের স্বপ্নিল প্যাগোডা।
মায়ানমারের প্যাগোডার বিশেষত্ব
-
সোনালি গম্বুজ – বেশিরভাগ প্যাগোডাই সোনার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত। সূর্যের আলো পড়লে পুরো স্থাপত্য ঝলমল করে ওঠে।
-
বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক – এই সব প্যাগোডা বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের অন্যতম নিদর্শন।
-
স্থাপত্যশৈলী – উচ্চ গম্বুজ, সূক্ষ্ম কারুকার্য, প্রবেশদ্বারের আলংকারিক খিলান।
-
শান্তির বার্তা – প্যাগোডার চারপাশের পরিবেশ সবসময় শান্ত ও ধ্যানমগ্ন।
এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলিকেই এবার ক্যাল্যাণীর প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তোলা হবে।
প্যান্ডেল নির্মাণের পরিকল্পনা
আকার ও নকশা
-
পুরো প্যান্ডেলটির উচ্চতা প্রায় ৭৫ ফুট করা হচ্ছে।
-
বাইরের অংশে সোনালি রঙের কাপড়, থার্মোকল, ফাইবার ও কাঠ ব্যবহার হবে।
-
প্রবেশদ্বার বানানো হচ্ছে বিশাল খিলানের আকারে।
ভেতরের সাজসজ্জা
-
ভেতরে থাকবে বৌদ্ধ ধর্মচক্র, বুদ্ধমূর্তির প্রতীকী ব্যবহার।
-
দেয়ালে লাগানো হবে কাঠের খোদাই করা নকশা।
-
দর্শনার্থীরা যেন সত্যি সত্যি মায়ানমারের কোনো প্যাগোডার ভেতরে প্রবেশ করেছেন, সেই অভিজ্ঞতা দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
প্রতিমা ও শিল্পকলা
দুর্গা প্রতিমা থাকবে ঐতিহ্যবাহী ঢঙে। তবে প্রতিমার পিছনের ব্যাকড্রপ সাজানো হবে প্যাগোডার মূল গম্বুজের আদলে। সোনালি আলোয় ঝলমল করবে গোটা প্রতিমা মণ্ডপ।
শিল্পীরা চেষ্টা করছেন—প্রতিমা যাতে আধ্যাত্মিক শান্তির সাথে শক্তির প্রতীক হিসেবেও প্রকাশ পায়। তাই দেবী দুর্গা ঐতিহ্যবাহী রূপে হলেও পুরো পরিবেশটি হবে ভিন্ন স্বাদের।
আলোকসজ্জা ও প্রযুক্তি
-
পুরো প্যান্ডেল জুড়ে ব্যবহার করা হবে LED লাইট।
-
3D লাইট ম্যাপিং প্রযুক্তি দিয়ে রাতে প্যাগোডার দেয়ালে বিভিন্ন আলোর খেলা দেখা যাবে।
-
সাউন্ড সিস্টেমে বাজবে বৌদ্ধ মন্ত্র ও শান্ত সঙ্গীত, মাঝে মাঝে ঢাকের শব্দ মিশবে।
দর্শনার্থীদের আকর্ষণ
ক্যাল্যাণী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষদের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রচুর উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই থিমের পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। আশা করা হচ্ছে—
-
কলকাতা, হাওড়া, উত্তরপাড়া, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এমনকি উত্তরবঙ্গ থেকেও দর্শক আসবেন।
-
অনেক ফটোগ্রাফার এই প্যান্ডেলের ছবি তুলতে আসবেন।
-
স্থানীয় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকানগুলির ব্যবসাও বাড়বে।
ক্যাল্যাণী শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়
ক্যাল্যাণী শুধু শিক্ষানগরী নয়, বরং পুজো প্যান্ডেলের ক্ষেত্রেও ক্রমশ বিখ্যাত হয়ে উঠছে। এখানে কয়েকটি বড় ক্লাব প্রতিবছর অভিনব থিম করে। এর ফলে শহরটি এখন কলকাতা ও অন্যান্য জেলার মানুষের কাছে প্যান্ডেল হপিংয়ের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় মানুষের ভূমিকা
-
প্যান্ডেল তৈরিতে বহু স্থানীয় শ্রমিক, শিল্পী যুক্ত আছেন।
-
এলাকার মানুষ অর্থসাহায্যও করেছেন।
-
পুজোর সময় ভিড় সামলাতে স্বেচ্ছাসেবকরা থাকবেন।
এইভাবে পুজোটা শুধু ক্লাবের নয়, গোটা এলাকার উৎসব হয়ে উঠেছে।
সামাজিক বার্তা
লুমিনাস ক্লাব প্রতি বছরই একটি সামাজিক বার্তা দেয়। এবছর তারা বলছেন—
“শান্তিই জীবনের মূল মন্ত্র। ধর্ম, জাতি, ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই মানুষ।”
এই বার্তাই মায়ানমারের প্যাগোডা থিমের মাধ্যমে তারা দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
-
CCTV ক্যামেরা বসানো হবে।
-
পুলিশের নজরদারি থাকবে।
-
জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।
-
আগুন লাগলে নেভানোর জন্য ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকবে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
ক্লাব কর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছরে তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনো ঐতিহ্যকে থিম হিসেবে নিতে চান।
উপসংহার
ক্যাল্যাণী ITI মোড় লুমিনাস ক্লাব ২০২৫ সালের দুর্গাপুজো বা কালীপুজোকে শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও শিল্প উৎসবে রূপান্তরিত করতে চলেছে। মায়ানমারের প্যাগোডার আভা এবার ভেসে উঠবে ক্যাল্যাণীর মাটিতে। দর্শকদের জন্য এটি হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা—যেখানে শক্তি, শান্তি, শিল্প আর আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।
FAQ
প্রশ্ন ১: ক্যাল্যাণী ITI মোড় লুমিনাস ক্লাব ২০২৫ সালের থিম কী?
👉 এবারের থিম হলো মায়ানমারের বিখ্যাত হসিনবিউমে প্যাগোডা।
প্রশ্ন ২: আগের বছরগুলোতে ক্যাল্যাণী ITI মোড়ে কোন কোন থিম হয়েছিল?
👉 ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার টুইন টাওয়ার, ২০২৩ সালে গ্র্যান্ড লিসবোয়া হোটেল, আর ২০২৪ সালে ব্যাংককের ওয়াট অরুন মন্দির।
প্রশ্ন ৩: কেন ক্যাল্যাণী ITI মোড় প্যান্ডেল এত বিখ্যাত?
👉 আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের অনন্য রূপ, আলোকসজ্জা ও ভিড় টানার ক্ষমতার জন্য এটি বিশেষ পরিচিত।
প্রশ্ন ৪: ক্যাল্যাণীর প্যান্ডেল কোথা থেকে দর্শক আসেন?
👉 শুধু ক্যাল্যাণী নয়, কলকাতা ও আশেপাশের জেলাগুলো থেকেও হাজারো মানুষ দেখতে আসেন।
প্রশ্ন ৫: ক্যাল্যাণী ITI মোড় প্যান্ডেলের ২০২৫ সালের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
👉 সাদা আভাময় প্যান্ডেল, হসিনবিউমে প্যাগোডার স্থাপত্যরূপ, আধুনিক আলোকসজ্জা এবং ভক্তিময় পরিবেশ।
আরো পড়ুন
আজকের সোনার দাম ২০২৫ (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫): আশ্চর্যজনক হারের পরিবর্তন এবং সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

[…] […]