2025 যেসব ক্লাব Utilization Certificate জমা দেয়নি তাদের দুর্গা পূজার অনুদান দেওয়া হবে না

ভূমিকা
বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গা পূজা। এই পূজা শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি ক্লাব, প্রতিটি শহর—সব জায়গায় দুর্গাপূজা মানেই নতুন প্রাণ, আনন্দ, ভিড় আর আলোর মেলা। কিন্তু এই আনন্দ উৎসবের পেছনে প্রয়োজন হয় প্রচুর টাকা। রাজ্য সরকার গত কয়েক বছর ধরে দুর্গা পূজার কমিটিগুলিকে অনুদান দিয়ে আসছে, যাতে তাঁরা আর্থিক চাপ সামলে সুন্দরভাবে পূজা আয়োজন করতে পারেন।
কিন্তু সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে জানানো হয়েছে—যেসব ক্লাব বা পূজা কমিটি গত বছরের অনুদানের “utilization certificate” জমা দেয়নি, তারা আর কোনও অনুদান পাবে না। আদালতের এই নির্দেশ রাজ্যের হাজার হাজার ক্লাব ও পূজা আয়োজকদের জন্য এক বিরাট বার্তা।https://www.youtube.com/live/Oq-gRq0KeIM?si=Zeqq1m64KiqEg10c
এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র—এই নির্দেশ কেন এলো? utilization certificate আসলে কী? আর এর প্রভাব কী হতে পারে দুর্গাপূজার আনন্দে? চলুন, বিষয়টা একেবারে সহজ ভাষায় খুঁটিনাটি দেখে নেওয়া যাক।
অনুদান কীভাবে শুরু হয়েছিল
২০১৮ সালে প্রথম রাজ্য সরকার দুর্গা পূজা কমিটিগুলিকে অনুদান দেওয়া শুরু করে। শুরুতে প্রতি ক্লাবকে দেওয়া হতো প্রায় ১০,০০০ টাকা। সেই সময় থেকেই সমালোচনা শুরু হয়—কেন শুধু দুর্গাপূজার জন্য সরকারি অর্থ খরচ করা হবে? কিন্তু সরকারের যুক্তি ছিল—এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক উৎসব, যার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ, শিল্পী, কুমোর, কারিগর, আলোসজ্জা ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা কর্মী, ছোটখাটো ব্যবসায়ী—সবাই।
বছরের পর বছর এই অনুদানের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় প্রায় ৮৫,০০০ টাকা প্রতি ক্লাব। আর এবার, ২০২৫ সালে, প্রতিটি ক্লাব পেতে চলেছে ১,১০,০০০ টাকা। সংখ্যাটা ছোট নয়। হাজার হাজার ক্লাব মিলে এই টাকার অঙ্ক কোটি কোটি টাকার সমান।
utilization certificate কী?
এবার প্রশ্ন আসতে পারে—utilization certificate আসলে কী জিনিস?
সহজভাবে বললে, সরকার যে টাকা দিল, সেটা কীভাবে খরচ হলো, তার একটা হিসাব বা রিপোর্ট দিতে হয়। সেই রিপোর্টকেই বলে utilization certificate।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও ক্লাব সরকার থেকে ৮৫,০০০ টাকা অনুদান পায়, তাহলে পূজা শেষে তাদের লিখিতভাবে জানাতে হবে—
-
টাকা কোন কোন কাজে খরচ হলো (যেমন: প্যান্ডেল তৈরি, আলো, সাউন্ড, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নিরাপত্তা ইত্যাদি)।
-
তার জন্য রসিদ, বিল বা ভাউচার জমা দিতে হবে।
-
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সব নথি প্রশাসনের কাছে জমা করতে হবে।
এটা জমা দিলে বোঝা যাবে টাকা সঠিক কাজে ব্যবহার হয়েছে।
হাইকোর্ট কেন কড়া হল?
2025 যেসব ক্লাব Utilization Certificate জমা দেয়নি তাদের দুর্গা পূজার অনুদান দেওয়া হবে না
গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, অনেক ক্লাব utilization certificate সময়মতো জমা দিচ্ছে না। এতে সমস্যা হচ্ছিল দুই দিক থেকে—
১. সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছিল।
যে টাকার উৎস মানুষের করের টাকা, সেই টাকার ব্যবহার ঠিক কীভাবে হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
২. অভিযোগ উঠছিল অপব্যবহারের।
কেউ কেউ অভিযোগ করছিলেন, এই টাকা শুধু পূজার কাজে নয়, অন্য অপ্রাসঙ্গিক জায়গায় খরচ করা হচ্ছে।
ঠিক এই কারণেই একাধিক জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের হয়। আদালতও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেয়। ২০২২ সাল থেকেই আদালত বারবার বলছিল—“utilization certificate না দিলে পরের বছর অনুদান দেওয়া যাবে না।”
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছিল, অনেক সময় তা মানা হচ্ছে না। এবার আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল—যে ক্লাব utilization certificate জমা দেয়নি, তারা আর অনুদান পাবে না।
কত ক্লাব utilization certificate জমা দেয়নি?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৪৪,৬৭৫টি ক্লাব অনুদান পেয়েছিল। এর মধ্যে কলকাতা পুলিশের অধীনে থাকা সব ক’টি ক্লাব utilization certificate জমা দিয়েছে। জেলায় অনুদান পাওয়া প্রায় সব ক্লাবও সার্টিফিকেট দিয়েছে।
তবে, মাত্র তিনটি ক্লাব—যারা সিলিগুড়ি কমিশনারেট এলাকায় ছিল—তারা utilization certificate দেয়নি।
অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে খুবই কম, কিন্তু নীতিগতভাবে আদালত বলেছে—“যারা দেননি, তারা এবার অনুদান পাবেন না।”
আদালতের নির্দেশের মূল পয়েন্ট
১. utilization certificate না জমা দিলে অনুদান নয়।
২. বিজয়া দশমীর এক মাসের মধ্যে utilization certificate জমা দিতে হবে।
৩. রাজ্য সরকারকে utilization certificate-এর যাচাই করা কপি জমা দিতে হবে।
৪. যারা আইন মানবে না, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুদানের বাইরে থাকবে।

মানুষের প্রতিক্রিয়া
এই নির্দেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
-
অনেকেই খুশি হয়েছেন। তাঁদের মতে, সরকারি টাকা যেহেতু সাধারণ মানুষের, তাই তার ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া জরুরি। এতে দুর্নীতি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে।
-
আবার অনেক ক্লাবের দুশ্চিন্তাও আছে। তাঁদের মতে, utilization certificate বানাতে গিয়ে অনেক সময় প্রযুক্তিগত ঝামেলা হয়, কাগজপত্র জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ছোট ছোট পাড়ার ক্লাবগুলি সমস্যায় পড়তে পারে।
সরকারের অবস্থান
রাজ্য সরকারও আদালতের এই নির্দেশকে সম্মান জানিয়েছে। সরকারি আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্লাবই utilization certificate দিয়েছে। কেবলমাত্র তিনটি ক্লাব নিয়ম মানেনি। তাই ব্যাপক সমস্যা হবে না।
তবে আদালত যেহেতু এবার কড়া অবস্থান নিয়েছে, ভবিষ্যতে কোনও ক্লাব নিয়ম ভাঙলে সরাসরি তারা অনুদান থেকে বঞ্চিত হবে।
উৎসব আর জবাবদিহি
একটা বিষয় স্পষ্ট—দুর্গা পূজা শুধুমাত্র আনন্দ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি ব্যয়। উৎসব যেমন আমাদের সংস্কৃতি, তেমনই জবাবদিহি থাকা জরুরি। আদালতের নির্দেশে সেই জবাবদিহির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল।
আজকের দিনে উৎসব মানে শুধু আনন্দ নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বও। utilization certificate সেই দায়িত্বের অংশ।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
এই নতুন নিয়ম কার্যকর করতে গেলে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে—
-
ছোট ক্লাবগুলির জন্য অনলাইনে utilization certificate জমা দেওয়া সহজ করতে হবে।
-
প্রশাসনকে দ্রুত যাচাই করে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।
-
স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য utilization certificate-এর সারাংশ জনসমক্ষে আনার কথাও ভাবা যেতে পারে।
FAQ
Q1. কলকাতা হাইকোর্ট কেন দুর্গা পূজা অনুদান নিয়ে নতুন নির্দেশ দিল?
👉 আদালত বলেছে, সরকারি অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করতে utilization certificate জমা বাধ্যতামূলক।
Q2. utilization certificate কী?
👉 এটি একটি রিপোর্ট যেখানে উল্লেখ থাকে অনুদানের টাকা কোন কাজে খরচ হলো, সঙ্গে থাকে বিল ও ভাউচার।
Q3. যদি কোনও ক্লাব utilization certificate জমা না দেয় তাহলে কী হবে?
👉 সেই ক্লাব আর কোনও অনুদান পাবে না। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে—জবাবদিহি ছাড়া অনুদান নয়।
Q4. গত বছর কত ক্লাব utilization certificate জমা দেয়নি?
👉 প্রায় ৪৪,৬৭৫ ক্লাবের মধ্যে মাত্র ৩টি ক্লাব utilization certificate দেয়নি।
Q5. utilization certificate জমা দেওয়ার শেষ সময় কখন?
👉 বিজয়া দশমীর এক মাসের মধ্যে প্রতিটি ক্লাবকে utilization certificate জমা দিতে হবে।
উপসংহার
কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ আসলে এক বড় বার্তা। দুর্গাপূজা যেমন বাংলার প্রাণের উৎসব, তেমনই এর সঙ্গে যুক্ত আছে সরকারি অর্থ, জনস্বার্থ ও স্বচ্ছতা। আদালত চেয়েছে যাতে কোনওভাবেই সরকারি অর্থের অপব্যবহার না হয়।
যেসব ক্লাব utilization certificate জমা দেবে না, তারা আর অনুদান পাবে না—এই নিয়ম শুধু ক’টি ক্লাবের জন্য নয়, বরং সব ক্লাবের জন্য এক সতর্কবার্তা।
বাংলা যতই উৎসবপ্রেমী হোক, দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। আনন্দের সঙ্গে যদি জবাবদিহিও থাকে, তবে তবেই পূর্ণ হবে দুর্গোৎসবের মাহাত্ম্য।
এটাও দেখুন
👉 একদিনে রেকর্ড যাত্রী কলকাতা মেট্রোয় গ্রীন লাইনে ৮০ হাজারের যাত্রা – ব্লু লাইনে আয় কোটি টাকা পেরোল

[…] […]
[…] […]