গর্তে ভরা রাস্তা নিয়ে জনস্বার্থ মামলা: হাইকোর্টে উঠল নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

ভূমিকা
শহর হোক বা গ্রাম – রাস্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান ভরসা। অফিস যাওয়া, স্কুলে পড়ুয়া শিশুদের যাতায়াত, বাজারে যাওয়া, অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেড – সবকিছুর জন্য রাস্তার সঠিক অবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের অনেক জায়গায় আজ রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে রাস্তা গর্তে ভর্তি হয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে নিত্যদিন। এই অবস্থার বিরুদ্ধে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে এক জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের হয়েছে। আদালতে প্রশ্ন উঠেছে – রাস্তা সংস্কারে অবহেলা কি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়?
রাস্তার বর্তমান পরিস্থিতি
কলকাতা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা, শহর ও গ্রামীণ এলাকায় গর্তে ভরা রাস্তায় মানুষ চলাচল করছে। কোথাও গর্তে জল জমে থাকে দিনের পর দিন, কোথাও আবার বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়ে গাড়ি চালানোই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
-
অফিস টাইমে বাইক বা স্কুটারে চলাচল করা মানেই প্রাণ হাতে করে চলা।
-
অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি হয়, অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়।
-
স্কুল পড়ুয়া বাচ্চারা পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছে।
-
বৃষ্টির দিনে তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, কারণ জল জমে গেলে গর্ত বোঝাই যায় না।
এমন চিত্র শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ—সব জায়গায়ই দেখা যায়।
জনস্বার্থ মামলা কেন জরুরি হলো
নাগরিকরা বহুবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। পৌরসভা, পঞ্চায়েত, পুরসভার দফতরে চিঠি গিয়েছে। কিন্তু সংস্কার কাজ হয় হয়তো কিছুটা, আবার কিছুদিন পর রাস্তা ভেঙে যায়। ফলে মানুষকে বারবার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কয়েকজন সমাজকর্মী এবং আইনজীবী মিলে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন। তাঁদের বক্তব্য –
-
রাস্তার বেহাল অবস্থা নাগরিকদের “জীবনের অধিকার” (Right to Life) কে লঙ্ঘন করছে।
-
দুর্ঘটনায় আহত ও মৃতদের জন্য দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে।
-
রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাস্তা সংস্কারের নির্দেশ দিতে হবে।
হাইকোর্টের অবস্থান
মামলা ওঠার পর হাইকোর্ট গুরুতরভাবে বিষয়টি গ্রহণ করেছে। বিচারপতিরা বলেছেন –
-
নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
-
গর্তে ভরা রাস্তায় দুর্ঘটনা হলে তা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রশাসনিক অবহেলার ফল।
-
আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, রাস্তা সংস্কার না করা মানে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।
এমনকি আদালত প্রশ্ন তুলেছে – রাস্তা মেরামতের জন্য যে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, তা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তারও নিরীক্ষা প্রয়োজন।
নাগরিক জীবনে প্রভাব
গর্তে ভরা রাস্তার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে অসুবিধা হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
-
অর্থনৈতিক ক্ষতি: গাড়ির টায়ার, সাসপেনশন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেরামতে বাড়তি খরচ।
-
মানসিক চাপ: প্রতিদিন দুর্ঘটনার ভয় নিয়ে চলাফেরা।
-
শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র: রাস্তায় যানজট ও দেরির কারণে সময়মতো স্কুল-অফিসে পৌঁছানো মুশকিল।
-
স্বাস্থ্য পরিষেবা: দুর্ঘটনায় আহত বা অন্য রোগীর ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স দেরিতে পৌঁছানো মানে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি।
মানুষের অভিজ্ঞতা – বাস্তব চিত্র
অনেক মানুষ জানিয়েছেন তাঁদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা –
-
এক কলেজ ছাত্র বাইকে করে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ রাস্তার বড় গর্তে পড়ে গুরুতর আহত হন।
-
এক গর্ভবতী মহিলা অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন, মাঝপথে গর্তে ধাক্কা খেয়ে অ্যাম্বুলেন্স বিকল হয়ে যায়।
-
সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে প্রায়ই পড়ে গিয়ে বা পিছলে গিয়ে আঘাত পাচ্ছেন।
এই ধরনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে বিষয়টি কতটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
গর্তে ভরা রাস্তা নিয়ে জনস্বার্থ মামলা: হাইকোর্টে উঠল নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন
পরিকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন – রাস্তার মানোন্নয়ন শুধুমাত্র পিচ ঢেলে দিলেই হবে না। সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
-
দীর্ঘস্থায়ী মেরামত: অস্থায়ী প্যাচওয়ার্ক না করে দীর্ঘস্থায়ী রাস্তা তৈরি করতে হবে।
-
বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি: উন্নত প্রযুক্তি ও টেকসই উপকরণ ব্যবহার জরুরি।
-
দুর্নীতি রোধ: রাস্তা মেরামতের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের জবাবদিহিতা
হাইকোর্টে মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারের তরফে আইনজীবীরা জানিয়েছেন –
-
বর্ষার জন্য রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
-
ইতিমধ্যেই অনেক জায়গায় সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে।
-
বাজেট সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকারের চেষ্টা অব্যাহত।
কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে – অজুহাত নয়, ফলাফল চাই। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
আইনগত দিক
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকার আছে। এর অর্থ শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন যাপন।
রাস্তার বেহাল অবস্থা যদি মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়, তবে তা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। এই ভিত্তিতেই জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে।
সমাধানের পথ
১. নিয়মিত পরিদর্শন: প্রতিটি রাস্তা নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরীক্ষা করতে হবে।
২. অভিযোগ ব্যবস্থা: নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য হেল্পলাইন বা অ্যাপ চালু করতে হবে।
৩. দ্রুত মেরামত: অভিযোগ পেলেই দ্রুত মেরামত কাজ শুরু করতে হবে।
৪. স্বচ্ছতা: রাস্তা সংস্কারের বাজেট ও কাজের তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
৫. দায়িত্ব নির্ধারণ: কোনো এলাকায় দুর্ঘটনা হলে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার ও দপ্তরকে জবাবদিহি করতে হবে।
নাগরিকদের প্রত্যাশা
মানুষ আজ হাইকোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁরা আশা করছেন আদালত কঠোর নির্দেশ দেবে, যাতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়। কারণ রাস্তা শুধুমাত্র চলাচলের মাধ্যম নয় – এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
উপসংহার
গর্তে ভরা রাস্তা কোনো সাধারণ সমস্যা নয়। এটি নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন, এটি মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। হাইকোর্টে উঠা এই জনস্বার্থ মামলা নতুন আশা জাগিয়েছে – হয়তো এবার প্রশাসন নড়েচড়ে বসবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় প্রকল্প নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করা। আর তার প্রথম শর্তই হলো “ভালো রাস্তা”।
এটাও দেখুন
👉 নতুন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রস্তুতি তুঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ফের আশার আলো
👉 এসএসসি নিয়োগ কেলেঙ্কারি: তৃণমূল বিধায়ক জিবন কৃষ্ণ সাহা গ্রেফতার ও ইডির বড় পদক্ষেপ
