রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন হরমনপ্রীতেরা, ‘তোমাদের জন্য গর্বিত’, বললেন দ্রৌপদী মুর্মু

ভারতের মেয়েরা ইতিহাস গড়েছে! বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জিতে এনেছে স্বপ্নের ট্রফি। গোটা দেশ যখন এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত, তখন একে একে দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে এলেন হরমনপ্রীত কৌর ও তাঁর সহ-খেলোয়াড়েরা।
বুধবার দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। তার পরদিন, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে। গর্বে উজ্জ্বল মুখে বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবি তোলেন ভারতের এই জয়ী কন্যারা।
রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা: “তোমাদের জন্য গর্বিত ভারত”
সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এক আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেন সমাজমাধ্যমে। তিনি লেখেন —
“মহিলাদের বিশ্বকাপ জেতার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রত্যেক সদস্যকে হৃদয় থেকে শুভেচ্ছা জানাই। প্রথম বার ট্রফি জিতে ওরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আগে থেকেই ভাল খেলছিল, কিন্তু এবার ওরা নিজেদের প্রতিভা এবং পারফরম্যান্সের প্রকৃত পুরস্কার পেয়েছে। এই কালজয়ী মুহূর্ত ভারতের মহিলাদের ক্রিকেটকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। যে ভাবে গোটা দেশকে গর্বিত করেছে, তার জন্য মেয়েদের আমি গভীর সমীহ করি।”
রাষ্ট্রপতির এই পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা লিখেছেন — “এটাই ভারতের গর্বের মুহূর্ত। এই মেয়েরা প্রমাণ করেছে, ভারতীয় ক্রিকেট শুধু পুরুষদের নয়, নারীদেরও।”
প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে দেখা: আবেগঘন মুহূর্ত
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন হরমনপ্রীতরা। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখেও শোনা যায় গর্বের সুর —
“তোমরা শুধু ক্রিকেট খেলোনি, তোমরা কোটি ভারতীয় মেয়েকে স্বপ্ন দেখিয়েছ। তোমাদের এই জয় ভারতের প্রতিটি নারীর জয়ের প্রতীক।”
মোদীজি কথার মাঝেই হরমনপ্রীতকে একটি প্রশ্ন করেন,
“বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ ক্যাচ ধরার পর বলটা পকেটে পুরে নিয়েছিলে কেন?”
এই প্রশ্নের উত্তরে হরমনপ্রীতের আবেগঘন জবাব সবাইকে ছুঁয়ে যায় —
“জানতাম না যে বলটা আমার কাছেই আসবে। হয়তো এটা ঈশ্বরেরই পরিকল্পনা ছিল। মনে হয়েছিল, এত বছরের পরিশ্রম অবশেষে সার্থক হলো। তাই সেই বলটা নিজের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সারা জীবন এই বলটা আমার কাছে থাকবে।”
সেই মুহূর্তে পুরো ঘর হাততালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
হরমনপ্রীতের স্মৃতি: “২০১৭ সালে ট্রফি আনতে পারিনি”
আলোচনার সময় হরমনপ্রীত বলেন —
“২০১৭ সালে বিশ্বকাপ শেষে আপনার (মোদীজি) সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তখন ট্রফি আনতে পারিনি। আজ পারলাম। আশা করব, ভবিষ্যতেও আপনার সঙ্গে এ রকম ছবি তুলতে পারব।”
এই কথায় স্পষ্ট হয়ে যায় দলের অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস। হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ভারতীয় মহিলা দল শুধু ট্রফি জেতেনি, বরং সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের মন জয় করেছে।
রাষ্ট্রপতি ভবনে আনন্দের ছোঁয়া

রাষ্ট্রপতি ভবনের ঐতিহাসিক অশোক হলে যখন দলটি প্রবেশ করে, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি, খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত প্রশাসক, ও ক্রীড়া মন্ত্রকের প্রতিনিধি। মেয়েদের হাতে চকচকে ট্রফি, মুখে বিজয়ের হাসি — পুরো পরিবেশ যেন উৎসবমুখর।
রাষ্ট্রপতি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে আলাদা করে করমর্দন করেন, তাঁদের অভিনন্দন জানান এবং বলেন —
“তোমরা শুধু খেলোয়াড় নও, তোমরা দেশের প্রেরণা।”
বিশেষভাবে তিনি অধিনায়ক হরমনপ্রীত ও কোচ অমল মুজুমদারকে প্রশংসা করেন, দলকে একসঙ্গে রেখে সফল করার জন্য।
কোচ অমল মুজুমদারের মন্তব্য
বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে এই মানুষটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভারতের মহিলা দলের কোচ অমল মুজুমদার জানান —
“জুন মাসে ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়ে রাজা চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু সেখানে নিয়ম ছিল, ২০ জনের বেশি নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাই সাপোর্ট স্টাফদের নিতে পারিনি। তখন মেয়েরা বলেছিল, ‘এই ছবিটা দরকার নেই, আমরা চাই মোদীজির সঙ্গে দেশের মাটিতে ছবি তুলতে।’ আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হলো।”
তাঁর এই কথায় বোঝা যায় দলের মধ্যে কতটা দেশপ্রেম ও আবেগ কাজ করছে।
ভারতের জয়, বিশ্বের প্রশংসা
বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের মেয়েদের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেয় ভারত। এই জয় শুধু ক্রিকেট নয়, এটি এক প্রতীক — ভারতীয় নারীর দৃঢ়তা, প্রতিভা ও পরিশ্রমের।
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে ভারতের এই সাফল্যের প্রশংসা হচ্ছে। বিদেশি ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকেও অভিনন্দন বার্তা এসেছে। আইসিসি জানিয়েছে, “ভারতীয় মহিলা দলের এই জয় ভবিষ্যতের প্রজন্মের মেয়েদের খেলাধুলায় এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেবে।”
দেশের নানা প্রান্তে উদযাপন
পঞ্জাব থেকে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুম্বই—সব জায়গায় এই জয়কে কেন্দ্র করে চলছে উদযাপন। মেয়েদের সংবর্ধনা দিতে রাজ্য সরকারগুলিও প্রস্তুত। শিলিগুড়ি, লুধিয়ানা, মুম্বইয়ে রঙিন শোভাযাত্রা, পতাকা উড়ছে, বাজছে ঢোল-নগাড়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ বলছেন —
“হরমনপ্রীতরা প্রমাণ করলেন, মেয়েরা কোনো দিকেই পিছিয়ে নেই।”
ফটোসেশনে ঐতিহাসিক মুহূর্ত
রাষ্ট্রপতি ভবনের সিঁড়িতে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে দলের সদস্যরা ছবি তোলেন। রাষ্ট্রপতির পাশে হরমনপ্রীত, ঝুলন গোস্বামী, স্মৃতি মান্ধানা, শেফালি বর্মা—সবাই হাসিমুখে পোজ দেন।
এই ছবিগুলো এখন ভারতের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। একদিকে রাষ্ট্রপতির গর্বভরা হাসি, অন্যদিকে মেয়েদের চোখে উজ্জ্বল স্বপ্ন—এক অমলিন মুহূর্ত।
মেয়েদের সাফল্যের অর্থ
এই বিশ্বকাপ জয়ের অর্থ শুধু একটি ট্রফি নয়। এটি প্রমাণ করে যে, মেয়েদের প্রতিভা ও পরিশ্রমকে সঠিক সুযোগ দিলে তারা যে কোনো ক্ষেত্রেই বিশ্বজয় করতে পারে।
রাষ্ট্রপতির কথাতেই যেন প্রতিধ্বনিত হলো সেই বার্তা —
“এই জয় ভারতের কোটি মেয়ের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগাবে। দেশের প্রতিটি মেয়ে যেন ভাবে — আমিও পারব!”
ভবিষ্যতের লক্ষ্য
জয়ের আনন্দে ভাসলেও দলের লক্ষ্য এখন আরও বড়। কোচ ও অধিনায়িকা জানিয়েছেন, পরবর্তী লক্ষ্য টেস্ট সিরিজে জেতা এবং নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক স্তরে গড়ে তোলা।
দল সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বকাপ জয়ী এই স্কোয়াডের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে আগামী অলিম্পিক্সেও দেখা যেতে পারে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও ঘোষণা করেছে, মহিলা ক্রিকেটের পরিকাঠামো আরও উন্নত করা হবে।
জনতার ভালোবাসা
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন হরমনপ্রীতরা! বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় মেয়েদের উদ্দেশে দ্রৌপদী মুর্মুর গর্বভরা বার্তা
দল দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের রাস্তায় মানুষ তাঁদের অভ্যর্থনা জানায়। কেউ ফুলের মালা পরায়, কেউ সেলফি তোলে, কেউ চিৎকার করে বলে — “চ্যাম্পিয়নস! চ্যাম্পিয়নস!”
এই ভালোবাসা দেখেই হরমনপ্রীত বলেন —
“এই জয় আমরা দেশবাসীর জন্য। আমাদের সাফল্যের আসল প্রেরণা তোমরাই।”
উপসংহার: গর্বের ভারতের কন্যারা
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক স্মরণীয় অধ্যায়। এটি প্রমাণ করে, মেয়েদের এই জয় রাষ্ট্রীয় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আজ হরমনপ্রীতদের হাতের ট্রফি শুধু ক্রিকেটের নয়, এটি এক জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। রাষ্ট্রপতি যেমন বলেছেন —
“তোমাদের জন্য গর্বিত ভারত।”
এই বাক্যটাই যেন আজ কোটি ভারতীয়র হৃদয়ের প্রতিধ্বনি।
আরও পড়ুন :
তেরঙায় মোড়া গাড়িতে চেপে ফিরছেন রিচা ঘোষ! বিশ্বজয়ী মেয়েকে বরণে সাজছে শিলিগুড়ি
