দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে নিয়ে বিতর্কের সূচনা
পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র দিঘা এখন শুধু তার সৈকতের জন্যই নয়, বরং ধর্মীয় এক নতুন বিতর্কের কারণেও আলোচনায় এসেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু — দিঘার জগন্নাথ মন্দির।
প্রশ্ন উঠেছে — এই মন্দিরকে কি ‘ধাম’ বলা যেতে পারে?
গত জুলাই মাসে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) এই প্রশ্ন নিয়েই কলকাতা হাই কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করেছিল। মামলার মূল বক্তব্য ছিল, দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে “ধাম” বলা হলে তা ভারতের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পরিভাষার বিকৃতি ঘটাবে।

মামলার মূল বিষয়বস্তু
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, “চারধাম”— বদরীনাথ, দ্বারকা, রামেশ্বরম এবং পুরী — এই চারটি স্থানই হিন্দু ধর্মে ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয়ভাবে ‘ধাম’ হিসেবে স্বীকৃত।
এই ‘চারধাম’ ধারণা হাজার বছরের পুরনো এবং শ্রী জগন্নাথ দেব, ভগবান বিষ্ণু ও শৈবধর্মের গভীর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
তাদের দাবি ছিল, দিঘার নতুন জগন্নাথ মন্দির যদিও রাজ্য সরকারের উদ্যোগে নির্মিত, কিন্তু তাকে ‘ধাম’ বলা হলে তা ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে একপ্রকার অন্যায় তুলনা ও বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতে, দিঘার মন্দির এখনই এমন মর্যাদা পেতে পারে না, কারণ তা শাস্ত্রীয়ভাবে স্বীকৃত নয়।
সংবিধানিক যুক্তি
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কেন বলা হচ্ছে ‘ধাম’? আদালতে মামলা তুলে নিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ!
মামলাকারীরা আদালতে বলেন, ভারতের সংবিধানের ২৫ এবং ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মাচরণ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বাধীনতা রয়েছে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের তরফে যদি কোনও মন্দিরকে ভুলভাবে “ধাম” বলা হয়, তা সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।
২৫ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করে,
আর ২৬ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গঠন ও পরিচালনার অধিকার দেয়।
এই অধিকারগুলির সঠিক রূপ বজায় রাখতে, তারা আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন।
কলকাতা হাই কোর্টের অবস্থান
কলকাতা হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়।
শুরুতে আদালত মামলাটি গ্রহণ করলেও, একাধিকবার শুনানি মুলতবি করার আবেদন করা হয়।
অবশেষে, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর (মঙ্গলবার) বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আদালতে জানায়, তারা এই জনস্বার্থ মামলা প্রত্যাহার করতে চায়।
বিচারপতি পালের বেঞ্চ এই আবেদন গ্রহণ করে এবং মামলাটি প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।
তবে আদালত স্পষ্ট জানায় — ভবিষ্যতে যদি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা অন্য কোনও সংগঠন চায়, তারা নতুন করে মামলা দায়ের করতে পারবে।

দিঘার জগন্নাথ মন্দির — রাজ্যের নতুন ধর্মীয় কেন্দ্র
পশ্চিমবঙ্গ সরকার কয়েক বছর আগে দিঘায় একটি বৃহৎ জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।
ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে এই স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়, যাতে রাজ্যের পর্যটন ও ধর্মীয় আকর্ষণ একসঙ্গে বৃদ্ধি পায়।
মন্দিরটি বর্তমানে দিঘার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
রাজ্য পর্যটন দফতর একে “দিঘা জগন্নাথ ধাম” বলে প্রচার করছে।
এখানে নিয়মিত পুজো, ভোগ এবং দর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা হাজার হাজার পর্যটক ও ভক্তকে আকর্ষণ করছে।
“ধাম” শব্দের তাৎপর্য কী?
“ধাম” শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে, যার অর্থ — ঈশ্বরের আবাস বা পবিত্র স্থান।
হিন্দুধর্মে “চারধাম” বলতে সাধারণত চারটি পবিত্র স্থান বোঝানো হয় —
-
বদরীনাথ (উত্তর) – ভগবান বিষ্ণুর ধাম
-
দ্বারকা (পশ্চিম) – ভগবান কৃষ্ণের ধাম
-
রামেশ্বরম (দক্ষিণ) – ভগবান শিবের ধাম
-
পুরী (পূর্ব) – ভগবান জগন্নাথের ধাম
এই চারটি স্থানের মধ্যে পুরী ইতিমধ্যেই “জগন্নাথ ধাম” নামে প্রসিদ্ধ।
তাই দিঘার মন্দিরকে “ধাম” বলা হলে অনেকেই মনে করেন, তা পুরীর ঐতিহ্যের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অবস্থান ও যুক্তি
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ শুরু থেকেই বলে আসছে —
দিঘার জগন্নাথ মন্দির একটি সুন্দর ধর্মীয় প্রকল্প হলেও, তাকে “ধাম” বলা শাস্ত্রীয়ভাবে ভুল।
তাদের মতে, “ধাম” শব্দের ব্যবহার কেবলমাত্র ঐতিহাসিক ও প্রমাণিত ধর্মীয় স্থানের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত।
তারা আরও অভিযোগ করে, রাজ্য সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করছে, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে।
তবে মামলা প্রত্যাহারের পরও, সংগঠনটি জানিয়েছে যে তারা ভবিষ্যতে নতুন পদক্ষেপ নিতে পারে, যদি “ধাম” শব্দের ব্যবহার ধর্মীয় বিভ্রান্তি তৈরি করে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভক্তদের প্রতিক্রিয়া
দিঘা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা এই বিতর্কে বিভক্ত মত প্রকাশ করেছেন।
অনেকেই মনে করেন, “ধাম” শব্দটি ব্যবহারে কোনও ভুল নেই, কারণ এটি ভক্তির প্রতীক।
তাদের বক্তব্য — “যেখানে জগন্নাথ দেবের মন্দির, সেখানেই ধাম।”
অন্যদিকে, কেউ কেউ বলেন, “পুরীর ধাম” ও “দিঘার ধাম” একসঙ্গে থাকলে তা ধর্মীয় অর্থে বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
তবে একথা সকলেই মানেন — এই মন্দির দিঘার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রাজ্য সরকারের ভূমিকা
রাজ্য সরকারের পর্যটন দফতর ও পূর্ত দফতর যৌথভাবে এই মন্দির নির্মাণের কাজ করে।
দিঘার সমুদ্রতটে অবস্থিত এই মন্দিরটি রাজ্যের ধর্মীয় পর্যটনের অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের মতে, “ধাম” শব্দটি এখানে ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, শাস্ত্রীয় দাবি নয়।
তারা জানিয়েছে, দিঘার মন্দিরকে “জগন্নাথ ধাম” বলার মাধ্যমে রাজ্যের ভক্তি ও সংস্কৃতিকে আরও প্রসারিত করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই মামলাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়।
শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা বলেন, “বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অকারণে একটি সুন্দর ধর্মীয় প্রকল্পকে বিতর্কিত করছে।”
তাদের দাবি — রাজ্য সরকার কোনও ধর্মীয় বিকৃতি ঘটাচ্ছে না।
অন্যদিকে, বিজেপির একাংশ এই মামলার মাধ্যমে ‘ধর্মীয় সঠিকতা রক্ষার চেষ্টা’ বলেই মনে করে।
তাদের বক্তব্য, “জগন্নাথ ধাম’ শব্দটি যদি ব্যবহার করা হয়, তবে তা পুরীর সঙ্গে তুলনীয় হওয়া উচিত নয়।”
দিঘা মন্দিরের বর্তমান অবস্থা
২০২৫ সালে দিঘার জগন্নাথ মন্দির সম্পূর্ণরূপে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
এখানে প্রতিদিন সকালের আরতি, ভোগ বিতরণ, এবং সন্ধ্যার সঙ্গীত অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
পর্যটকরা বলেন, “এই মন্দির দিঘার নতুন প্রাণ।”
এছাড়া দিঘা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্যায়ন, রাস্তা সংস্কার এবং ভক্তদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
রাজ্য সরকার পরিকল্পনা করছে, ভবিষ্যতে এখানে বার্ষিক রথযাত্রা উৎসব আয়োজন করা হবে পুরীর আদলে।
ধর্মীয় ঐতিহ্য বনাম আধুনিক প্রচার
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় স্থানগুলিকে কেন্দ্র করে পর্যটন উন্নয়ন একটি সাধারণ বিষয়।
রাজ্য সরকার “ধর্মীয় পর্যটন সার্কিট” হিসেবে দিঘাকে গড়ে তুলতে চায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্য ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা খুব জরুরি।
“ধাম” শব্দটি কেবল একটি নাম নয়, এটি শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় প্রতীকের অংশ।
তাই কোনও নতুন স্থাপনাকে সেই মর্যাদা দিতে হলে জনগণের আস্থা ও শাস্ত্রীয় অনুমোদন দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের সিদ্ধান্তের প্রভাব
কলকাতা হাই কোর্টের এই সিদ্ধান্ত — যেখানে মামলাটি প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে — তা একপ্রকার সমঝোতার বার্তা দেয়।
এতে একদিকে যেমন ধর্মীয় সংগঠনগুলির মত প্রকাশের অধিকার বজায় থাকল, তেমনই সরকারও তাদের প্রকল্প চালিয়ে যেতে পারবে।
তবে আদালত যেভাবে ভবিষ্যতে নতুন মামলার সুযোগ রেখেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে — বিষয়টি এখানেই শেষ নয়।
যদি পরবর্তীতে “ধাম” শব্দ নিয়ে নতুন বিতর্ক ওঠে, তা আবার আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।
সারসংক্ষেপ
-
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে “ধাম” বলার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।
-
তাদের দাবি ছিল, “চারধাম” শাস্ত্রীয়ভাবে নির্ধারিত, তাই দিঘার মন্দির সেই মর্যাদা পেতে পারে না।
-
সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলা হয়।
-
কলকাতা হাই কোর্টে শুনানি শেষে ভিএইচপি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
-
আদালত ভবিষ্যতে নতুন মামলা দায়েরের সুযোগ রেখেছে।
-
রাজ্য সরকার বলছে, “ধাম” শব্দটি শ্রদ্ধার প্রতীক, কোনও শাস্ত্রীয় দাবি নয়।
-
মন্দির এখন দিঘার পর্যটনের নতুন মুখ হয়ে উঠেছে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কেন ‘ধাম’ বলা হচ্ছে?
উত্তর: রাজ্য সরকার ধর্মীয় পর্যটন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মন্দিরটিকে ‘ধাম’ নামে প্রচার করছে। এটি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: “ধাম” শব্দের আসল অর্থ কী?
উত্তর: “ধাম” মানে ঈশ্বরের আবাস বা পবিত্র স্থান। সাধারণত এটি ঐতিহাসিক চারটি পবিত্র স্থানের সঙ্গে যুক্ত।
প্রশ্ন ৩: আদালতের সিদ্ধান্ত কী?
উত্তর: কলকাতা হাই কোর্ট ভিএইচপি-কে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে, তবে ভবিষ্যতে নতুন মামলা দায়েরের সুযোগ রেখেছে।
প্রশ্ন ৪: এই মামলার ফলে মন্দিরের কাজ থেমে যাবে কি?
উত্তর: না, দিঘার জগন্নাথ মন্দির বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে খোলা এবং পর্যটকদের জন্য চালু রয়েছে।
প্রশ্ন ৫: দিঘার জগন্নাথ মন্দির কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: এটি পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দিঘা শহরে, সমুদ্রতটের কাছেই অবস্থিত।
আরও পড়ুন :
অবিশ্বাস্য! পশ্চিমবঙ্গে শুরু হলো গাছের গণনা – কত গাছ আছে? সুনির্দিষ্ট তথ্য সহ জানতে পড়ুন
