পুরাতন মালদা ব্লক অফিসের সামনে সোমবার দুপুর থেকে শুরু হয় এক তুমুল বিক্ষোভ। শতাধিক BLO (Booth Level Officer), যাঁদের অধিকাংশই এলাকার প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হন। তাঁদের মূল অভিযোগ — “দিনভর স্কুল সামলে রাতে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করা অসম্ভব।”
এই বিক্ষোভ ছিল SIR (Special Intensive Revision) কাজের সময়সূচি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিতে। শিক্ষকরা বলেন, সরকার থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে স্কুলের কাজ শেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যাবেলা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম ফিলাপের কাজ করতে হবে। কিন্তু তাঁরা মনে করেন, সংসার, পরিবার ও স্কুলের দায়িত্ব একসাথে সামলে এই বাড়তি কাজ করা বাস্তবে সম্ভব নয়।

দিনের কাজের পর রাতের ডিউটি, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষোভ
১৮১ নম্বর বুথের BLO তথা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পার্থ সান্যাল বলেন,
“আমরা সারাদিন স্কুলে পড়াই, তারপর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাম সংশোধন ও ফর্ম পূরণের কাজ করতে বলা হচ্ছে। এটা কি সম্ভব? সারাদিন কাজের পর শরীরও ক্লান্ত থাকে, আবার সংসারের দায়িত্বও থাকে। তাছাড়া রাতে মহিলাদের পক্ষে বাইরে কাজ করা একেবারেই নিরাপদ নয়। প্রশাসন আমাদের কোনও নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়নি।”
তিনি আরও বলেন,
“আমাদের দাবি, এই কাজ যেন স্কুল চলাকালীন বা অফিস আওয়ারের মধ্যে করা যায়। না হলে শিক্ষকদের পক্ষে এটা সম্ভব হবে না।”
শিক্ষিকা তৃপ্তি ভৌমিকের অভিজ্ঞতা: “নিরাপত্তার কোনও নিশ্চয়তা নেই”
পুরাতন মালদার এক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা তৃপ্তি ভৌমিক, যিনি ৩৫ নম্বর বুথের BLO, বলেন,
“আমি বহু বছর ধরে BLO হিসেবে কাজ করছি। আগে এমন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার সরকার থেকে যে নির্দেশ এসেছে, সেটা পুরোপুরি অবাস্তব। বিকেল চারটে পর্যন্ত স্কুল করি, বাড়ি ফিরতে পাঁচটা বেজে যায়। এরপর সংসার সামলে রাতে ভোটারদের বাড়ি যাওয়া কি সম্ভব? মহিলা হিসেবে এটা নিরাপদও নয়। ব্লক অফিস থেকেও কেউ বলতে পারছেন না, নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে।”
তিনি আরও জানান, “আমরা চাই, অন-ডিউটি সময়েই যেন এই কাজ করতে দেওয়া হয়। যদি দাবি না মানা হয়, তাহলে আমরা SIR-এর কাজ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবো।”

বিক্ষোভে উত্তাল পুরাতন মালদা ব্লক অফিস
সোমবার দুপুরে যখন ব্লক অফিসে প্রশাসনের পক্ষ থেকে BLO-দের জন্য প্রশিক্ষণ শিবির চলছিল, ঠিক তখনই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শতাধিক BLO অফিস থেকে বেরিয়ে ব্লক অফিসের সামনে বিক্ষোভে সামিল হন।
কেউ হাতে পোস্টার, কেউ আবার স্লোগান দিতে শুরু করেন —
“রাতে কাজ নয়, স্কুলের সময় কাজ চাই”,
“নিরাপত্তা চাই, ন্যায্য সময় চাই।”
এক BLO বলেন, “প্রশাসন আমাদের উপর যে চাপ দিচ্ছে, সেটা অন্যায়। আমরা ভোটের কাজ করতে রাজি, কিন্তু তারও একটা সীমা থাকা উচিত। দিনভর ক্লাস নিয়ে, তারপর রাতে ভোটারদের বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়।”
প্রশাসনের নীরবতা
প্রশাসনের তরফে জানা গিয়েছে, রাজ্য জুড়ে ৪ নভেম্বর থেকে SIR কাজ শুরু হবে। তার আগে BLO-দের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু BLO-দের ক্ষোভ ও দাবি প্রশাসনের কাছে নতুন নয়।
তাঁরা বহুদিন ধরেই এই বিষয়ে যুক্তিযুক্ত সময় ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তবুও আজ পর্যন্ত কোনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
যখন মালদার জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল-এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়, তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
BLO-দের বাস্তব সমস্যা ও মানবিক দিক
SIR Protest: ‘সংসার-স্কুল সামলে রাতে ভোটারদের বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়’, পুরাতন মালদায় বিএলও শিক্ষকদের বিক্ষোভ
পুরাতন মালদার শিক্ষক BLO-দের কথায়, তাঁরা ভোটের কাজের গুরুত্ব বোঝেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই কাজের সময়সূচি ও দায়িত্ব এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে শিক্ষকদের পক্ষে তা পালন করা সম্ভব হয়।
তাঁদের বক্তব্য —
-
দিনভর ক্লাস নেওয়ার পর রাতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া শারীরিকভাবে অসম্ভব।
-
পরিবার, সন্তান ও অসুস্থ আত্মীয়দের দেখাশোনার দায়িত্বও রয়েছে।
-
মহিলা শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে রাতে বাইরে যাওয়া নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে।
এই কারণে তাঁরা চেয়েছেন, BLO কাজ যেন অফিস আওয়ারের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় অথবা স্কুলে বিশেষ সময় বরাদ্দ করা হয়।
প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্ন
এই বিক্ষোভ শুধু পুরাতন মালদা নয়, গোটা রাজ্যের BLO-দের মধ্যে এক গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন।
শিক্ষকরা ইতিমধ্যেই নিয়মিতভাবে পাঠদান, পরীক্ষার কাজ, সরকারি প্রকল্প সংক্রান্ত নানা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তার সঙ্গে রাতের ভোটার তালিকা সংশোধন কাজ তাঁদের জন্য এক অতিরিক্ত চাপ।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন তাঁদের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
যদি BLO-দের দাবি মানা না হয়, তবে রাজ্যজুড়ে আরও বড় বিক্ষোভের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয়দের মতে, BLO-রা সবসময় এলাকায় ভোট সংক্রান্ত কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। তাঁদের অভিযোগ একেবারেই যৌক্তিক।
একজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা সারা বছর ছেলেমেয়েদের জন্য কাজ করেন। তারপর যদি রাতে তাঁদের বাড়ি বাড়ি যেতে হয়, তাহলে সেটা অন্যায়।”
একজন প্রাক্তন BLO বলেন, “এই কাজটা অনেক দায়িত্বের। কিন্তু কাজের সময় যদি এমনভাবে দেওয়া হয় যে তা করতে গিয়ে নিজের পরিবার ও নিরাপত্তা বিপন্ন হয়, তাহলে কেউই আগ্রহ দেখাবে না।”
উপসংহার
পুরাতন মালদায় BLO-দের এই প্রতিবাদ নিছক বিক্ষোভ নয়, এটি এক বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন। শিক্ষকরা রাজ্যের মেরুদণ্ড, তাঁদের সম্মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব।
SIR-এর কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই কাজ যেন মানবিকতা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়, সেই দাবিই আজ পুরাতন মালদার শিক্ষক BLO-রা তুলেছেন।
তাঁদের কণ্ঠস্বর হয়তো আগামী দিনে প্রশাসনের কানে পৌঁছাবে — আর তবেই প্রকৃত সমাধান মিলবে এই সমস্যার।
Read more :
👉 ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম কিভাবে খুঁজবেন? SIR ও Voter List Correction সম্পূর্ণ গাইড (2025)
