বারাসাতে কালীপুজোয় চার দিনের জন্য জাতীয় সড়কে চলাচল সীমাবদ্ধ থাকবে

বারাসাতে আসন্ন কালীপুজো উপলক্ষে প্রশাসনের তরফে বড় ঘোষণা এসেছে। নিরাপত্তা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবার কালীপুজোর চার দিন জাতীয় সড়কে গাড়ি চলাচলে কঠোর সীমাবদ্ধতা জারি করা হয়েছে। উৎসবের সময়ে মানুষের ভিড়, আলোর সাজ, প্যান্ডেল ঘোরা—সবকিছু মিলিয়ে যেন বারাসাত শহর একেবারে আলোকময় উৎসবে পরিণত হয়। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক যান চলাচল বজায় রাখার দায়িত্ব নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
সীমাবদ্ধতার সময় ও দিন
বারাসাত মহকুমা প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, কালীপুজোর আগের দিন থেকে ভোর রাত পর্যন্ত চার দিন এই নিয়ম বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ, ৮ নভেম্বর (শনিবার) থেকে ১১ নভেম্বর (মঙ্গলবার) পর্যন্ত জাতীয় সড়ক (NH-12) দিয়ে ভারী ও কিছু ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
বিশেষ করে বারাসাতের চাঁপাডালি, কল্যাণী মোড়, মাধ্যমগ্রাম ক্রসিং এবং হরিনাভি রুটে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। এসব এলাকায় শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবা যেমন অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
প্রতি বছর কালীপুজোয় বারাসাতের রাস্তাগুলি প্যান্ডেল, ফানুস, আতসবাজি ও আলোকসজ্জায় জমজমাট হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ রাতে প্যান্ডেল দেখতে রাস্তায় নামেন। ফলে শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া জাতীয় সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই পুলিশ বিভাগ ও প্রশাসন একত্রে বসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বারাসাতের এসপি জানিয়েছেন, “মানুষ যেন নিরাপদে পুজো উপভোগ করতে পারেন, তাই আমরা কিছুক্ষণের জন্য চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনছি। এটা সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্যই।”
কোন কোন রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ থাকবে
জাতীয় সড়ক ১২ (আগের নাম NH-34) বরাবর বারাসাত হয়ে যে সমস্ত গাড়ি যায়—যেমন কল্যাণী, বনগাঁ, হাবড়া, কৃষ্ণনগর—সে সমস্ত গাড়ির জন্য বিকল্প রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
কলকাতা থেকে আসা যানবাহনকে দুমদুম-এয়ারপোর্ট-নিউটাউন-বীজলিপাড়ার রাস্তা দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে।
-
বনগাঁ বা হাবড়া থেকে আসা গাড়িগুলিকে চাঁদিপুর-বাগজোলা-বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে কলকাতা ঢোকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
স্থানীয় ছোট গাড়িগুলির জন্য নির্দিষ্ট সময়ে রাস্তা খোলা থাকবে, তবে রাত ৮টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
প্যান্ডেল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বারাসাতে কালীপুজোয় চার দিনের জন্য জাতীয় সড়কে চলাচল সীমাবদ্ধ থাকবে
বারাসাতে এ বছর প্রায় ৪৫০-রও বেশি কালীপুজো কমিটি অনুমোদন পেয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশে প্রত্যেক কমিটিকেই সিসিটিভি বসানো, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা ও নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য বারাসাত থানার পাশাপাশি র্যাফ ও ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম-ও থাকবে প্রস্তুত অবস্থায়। প্যান্ডেলের আশেপাশে থাকবে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ ক্যাম্প।
জনগণের জন্য বিশেষ নির্দেশ
বারাসাত পুলিশ প্রশাসন সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে কয়েকটি বার্তা দিয়েছে—
-
অপ্রয়োজনীয়ভাবে জাতীয় সড়কে ভিড় করবেন না।
-
প্যান্ডেল পরিদর্শনে গেলে ব্যক্তিগত গাড়ি না নিয়ে যতটা সম্ভব হাঁটুন বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করুন।
-
বাজি বা ফানুস ব্যবহার নিষিদ্ধ এলাকায় আইন মানুন।
-
জরুরি প্রয়োজনে ১০০ বা স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করুন।
-
কোনও সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানান।
পুজোর আনন্দে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান
প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, “আমরা জানি কালীপুজো মানেই বারাসাতের বিশেষ উৎসব। মানুষের ভিড়, আলোকসজ্জা, আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবকিছুই উপভোগ্য। তবে আনন্দ যেন বিশৃঙ্খলায় পরিণত না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। অনেকেই বলেছেন, গত বছর রাত্রে যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। এবার যদি চলাচল কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে সবার সুবিধা হবে।
প্রশাসনের সতর্কতা
বাজি পোড়ানো, শব্দদূষণ, এবং অবৈধ মদ বিক্রির উপরও নজরদারি বাড়ানো হবে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ টহল বাড়বে। ড্রোনের মাধ্যমে ভিড় ও রাস্তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশেষ করে চাঁপাডালি, হেলাবটতলা, রেলগেট, ও কলেজপাড়া এলাকার উপর নজর থাকবে সবচেয়ে বেশি।
উৎসব হোক নিরাপদ ও আনন্দময়
বারাসাতবাসীর কাছে কালীপুজো শুধুই ধর্মীয় উৎসব নয়—এটা একপ্রকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে বাধা হিসেবে নয়, বরং একটি নিরাপদ উৎসব উপহার দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।
যদি সবাই সহযোগিতা করেন, তাহলে চলাচলে সামান্য অসুবিধা হলেও উৎসব হবে আরও সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ।
উপসংহার
বারাসাতে কালীপুজো মানেই চারপাশে আলো, ফানুস, হাসিখুশি মানুষ আর প্যান্ডেলের ভিড়। তবে এই আনন্দের মাঝেও নিরাপত্তা সবার আগে। তাই জাতীয় সড়কে চার দিনের চলাচল সীমাবদ্ধতার এই সিদ্ধান্ত শহরের জননিরাপত্তার জন্য একেবারেই প্রয়োজনীয়।
প্রশাসন যেমন চেষ্টা করছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে, তেমনি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে—তবেই বারাসাতের কালীপুজো হবে সত্যিকারের “আনন্দ ও শৃঙ্খলার পুজো।”
এটাও দেখুন
👉 ২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিতে ফানুস ও বাজি নিষিদ্ধ: কলকাতায় প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ
