২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিতে ফানুস ও বাজি নিষিদ্ধ: কলকাতায় প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ

২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিকে সামনে রেখে কলকাতায় এবার প্রশাসন এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এবার শহরের আকাশে ফানুস উড়বে না, রাস্তায় বাজির শব্দও শোনা যাবে না। পরিবেশ ও জননিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ একসঙ্গে মিলিত হয়ে এই বছর সম্পূর্ণভাবে ফানুস ও বাজি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
কেন এই নিষেধাজ্ঞা?
গত কয়েক বছর ধরে দীপাবলি ও কালীপুজোর রাতে কলকাতার বায়ুর মান অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়ছে। বাজি পোড়ানোর কারণে শহরের বায়ুতে ধোঁয়া ও বিষাক্ত কণার মাত্রা বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যায়। শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ।
তাছাড়া, ফানুস উড়ানোর কারণে বারবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। শহরের বিভিন্ন বহুতল, দোকানপাট, এমনকি গাড়ির ছাদে পড়ে ফানুসের আগুন থেকে ছোট ছোট অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এই কারণেই প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবারে কঠোরভাবে ফানুস ও বাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় কী কী পড়ছে?
প্রশাসনের জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে—
-
সব ধরনের আতশবাজি (চকোলেট বোম, রকেট, টুবি, ফাউন্টেন ইত্যাদি) পোড়ানো নিষিদ্ধ।
-
ফানুস উড়ানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
-
বাড়ি, ছাদ বা রাস্তায় কেউ ফানুস উড়াতে বা বাজি পোড়াতে ধরা পড়লে সরাসরি জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
-
শুধুমাত্র সবুজ বাজি (Green Firecrackers) যদি কেউ লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান থেকে কেনে এবং নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার করে, তবেই কিছুটা ছাড় পাওয়া যেতে পারে—তাও পুলিশ অনুমতি ছাড়া নয়।
পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতা
কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই শহরের বিভিন্ন থানায় বিশেষ টিম গঠন করেছে। তারা কালীপুজোর আগের দিন থেকেই টহল শুরু করবে। নজরদারিতে থাকবে ড্রোন ক্যামেরাও, যাতে আকাশে কোথাও ফানুস উড়ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এছাড়া, পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট জানিয়েছেন—
“কোনওভাবেই নিয়ম ভাঙলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস নয়।”
রাতভর টহল চলবে বড় বড় এলাকায় যেমন—গড়িয়া, বেহালা, দমদম, বাগুইআটি, সল্টলেক, পার্ক সার্কাস ও উত্তর কলকাতার বহু অঞ্চলে।
পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ মানুষের ভূমিকা
প্রশাসন যেমন কঠোর হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। কলকাতার পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই প্রচার শুরু করেছে—
“ফানুস নয়, প্রদীপ জ্বালান — আলোয় ভরিয়ে তুলুন উৎসব।”
মানুষকে বোঝানো হচ্ছে যে, বাজির বিকল্প আনন্দও হতে পারে অনেক শান্তিপূর্ণ। যেমন—
-
বাড়িতে সুন্দর আলোকসজ্জা করা,
-
তেল প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালানো,
-
শিশুদের নিয়ে রঙিন আলো দিয়ে ঘর সাজানো,
-
ফানুসের পরিবর্তে রঙিন কাগজের লণ্ঠন ব্যবহার করা।
এইসব সহজ উদ্যোগের মাধ্যমেই কালীপুজো ও দীপাবলিকে পরিবেশবান্ধবভাবে পালন করা যায়।
নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া
এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন—
“বাজি ছাড়া দীপাবলি মানেই যেন অসম্পূর্ণ। শিশুরা আনন্দ পায় না।”
আবার অনেকে খুশি এই সিদ্ধান্তে। এক বাসিন্দা বলেন—
“আমার বাচ্চা হাঁপানিতে ভোগে। প্রতি বছর দীপাবলির পর ওর অবস্থা খারাপ হয়। এবার যদি বাজি বন্ধ হয়, সেটা অনেকের জন্য স্বস্তির।”
সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেকেই লিখেছেন, “শব্দদূষণ আর ধোঁয়ামুক্ত দীপাবলি” হোক এবারের প্রতিজ্ঞা।
আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানা
২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিতে ফানুস ও বাজি নিষিদ্ধ: কলকাতায় প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ
কলকাতা পুলিশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ জানিয়েছে,
-
নিষিদ্ধ বাজি পোড়ালে সর্বোচ্চ ₹৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
-
পুনরাবৃত্তি ঘটলে জেল সাজাও হতে পারে।
-
দোকানে অবৈধ বাজি বিক্রি করলে লাইসেন্স বাতিল ও ফৌজদারি মামলা হবে।
উৎসব মানেই সচেতনতা
কালীপুজো ও দীপাবলি হল আলো, আনন্দ ও শুভ শক্তির প্রতীক। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যের অসুবিধার কারণ হয়, তবে উৎসবের মানে হারিয়ে যায়। শহর এখন বুঝতে শিখছে—
“আলোয় হোক উৎসব, নয় দূষণে।”
প্রশাসন, পরিবেশবিদ, এমনকি বহু স্কুলও এবারে ‘নো বাজি ক্যাম্পেইন’ চালু করেছে। শিশুদের শেখানো হচ্ছে কিভাবে তারা পরিবারকে বোঝাতে পারে বাজির ক্ষতি সম্পর্কে।
ফানুস ছাড়া দীপাবলি—তবু আনন্দ থাকবে
ফানুস উড়ানো অনেকের কাছে শৈশবের স্মৃতি হলেও আজকের পরিস্থিতিতে সেটি এক বিপজ্জনক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফানুস থেকে লাগা আগুনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এমনকি বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় ফানুস উড়ালে বিমান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এবারে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।
কিন্তু আনন্দ কমবে না—শহরের বিভিন্ন ক্লাব, আবাসন ও মণ্ডপে এবার লেজার লাইট শো, ডিজিটাল আলোকসজ্জা ও সংগীত উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। এতে যেমন পরিবেশের ক্ষতি নেই, তেমনি মানুষের মনও ভরে উঠবে আনন্দে।
FAQ (প্রশ্নোত্তর বিভাগ):
প্রশ্ন ১: ২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিতে কি ফানুস উড়ানো যাবে?
👉 না, কলকাতা শহরে এবারে ফানুস উড়ানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগুন লাগা ও দুর্ঘটনা এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ২: বাজি পোড়ানো কি পুরোপুরি বন্ধ?
👉 হ্যাঁ, সব ধরনের বাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ। তবে শুধুমাত্র পরিবেশবান্ধব “Green Firecracker” যদি সরকার অনুমোদিত দোকান থেকে কেনা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার করা হয়, তাহলে কিছুটা ছাড় থাকতে পারে।
প্রশ্ন ৩: নিয়ম ভাঙলে কী শাস্তি হতে পারে?
👉 নিষিদ্ধ বাজি পোড়ালে ₹৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং আইন অনুযায়ী জেলও হতে পারে।
প্রশ্ন ৪: পুলিশ কীভাবে নজরদারি করবে?
👉 কলকাতা পুলিশ ড্রোন ও বিশেষ টহলদারি টিম মোতায়েন করবে। ফানুস উড়ানো বা বাজি পোড়ানো ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন ৫: ফানুসের বিকল্প হিসেবে কী করা যেতে পারে?
👉 পরিবেশবান্ধব আলোকসজ্জা, প্রদীপ, রঙিন লণ্ঠন বা LED লাইট ব্যবহার করে উৎসব উদযাপন করা যেতে পারে, যা নিরাপদ ও সুন্দর।
উপসংহার
২০২৫ সালের কালীপুজো ও দীপাবলিতে কলকাতা দেখবে এক নতুন চেহারা—
-
ধোঁয়াহীন আকাশ,
-
শব্দহীন রাত,
-
এবং সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে এক আলোকিত উৎসব।
এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র আইনের বাধ্যবাধকতা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য এক সচেতন পদক্ষেপ। আমাদের প্রিয় শহরকে ধোঁয়া ও শব্দের জঞ্জাল থেকে মুক্ত রাখাই এখন আমাদের দায়িত্ব।
ফানুস নয়, আলো জ্বালান হৃদয়ে।
বাজি নয়, হাসি ছড়ান সকলের মুখে।
এই হোক এবারের কালীপুজো ও দীপাবলির মূল বার্তা।
এটাও দেখুন
👉 স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিন্স স্কলারশিপ (SVMCM) – পশ্চিমবঙ্গের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ
