বৃষ্টি বিদায় নিলেও সাবধান অক্টোবরেই আসতে পারে প্রবল ঘূর্ণিঝড়

এই তো সবে বর্ষার জল শুকিয়েছে। শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসছে। কিন্তু আবহাওয়াবিদরা এখনই নিশ্চিন্ত হতে মানা করছেন। কারণ অক্টোবর মাস মানেই বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের মরশুম। বৃষ্টি চলে গেলেও সমুদ্রের মেজাজ এখনও শান্ত হয়নি। আর সেই কারণেই এই মাসেই শক্তিশালী নিম্নচাপ তৈরি হয়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে আমাদের উপকূলে।
কেন অক্টোবরে এত বিপদ?
অক্টোবর মাসটা আসলে বেশ চালাক। এক দিকে বর্ষা শেষ হয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে শীত এখনও আসেনি পুরোপুরি। এই সময়ে সমুদ্রের জল থাকে গরম। বাতাসের চাপ আর তাপমাত্রার হেরফের চলতে থাকে প্রতিদিন। আর এই পরিস্থিতিই হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য একদম পারফেক্ট।
বঙ্গোপসাগর তো আসলে ঘূর্ণিঝড়ের বাসা বলা চলে। বছরের যে কোনো সময়ে এখানে ঝড় তৈরি হতে পারে। তবে মে আর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এই সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি। এখন যেহেতু অক্টোবর চলছে, তাই আবহাওয়া বিভাগের চোখ রয়েছে সমুদ্রের দিকে। প্রতিটা মেঘের গতিবিধি, বাতাসের দিক, জলের তাপমাত্রা – সবকিছুই দেখা হচ্ছে খুব সতর্কতার সঙ্গে।
নিম্নচাপ মানে কী আর কেন এটা এত বিপজ্জনক?
অনেকেই হয়তো ভাবেন নিম্নচাপ আবার কী? এটা আসলে খুব সহজ ব্যাপার। যখন সমুদ্রের কোনো একটা জায়গায় বাতাসের চাপ কমে যায়, তখন আশপাশের উঁচু চাপের এলাকা থেকে হাওয়া ছুটে আসে সেখানে। এই হাওয়া যখন ঘুরতে ঘুরতে আসে, তখনই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়।
সমস্যা হলো, এই নিম্নচাপ যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটা দুর্বল ঝড়ে থেমে থাকে না। সেটা ধীরে ধীরে পরিণত হয় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে। আর অক্টোবর মাসে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা যেহেতু ২৭-২৮ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকে, সেটা এই ঝড়কে আরও বেশি শক্তি যোগায়। মানে একবার নিম্নচাপ তৈরি হলে সেটা খুব দ্রুতই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আগের বছরগুলোতে কী হয়েছিল?
আমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই ফণী, আম্পান, ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের কথা। এগুলো সব এসেছিল এপ্রিল-মে আর অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যেই। ফণী এসেছিল ২০১৯ সালের মে মাসে। তারপর ২০২০ সালে আম্পান – সেই ঝড় যেটা কলকাতায় এনে দিয়েছিল ভয়ংকর ধ্বংসলীলা। এই ঝড়গুলো দেখিয়ে দিয়েছে বঙ্গোপসাগরের ঝড় কতটা মারাত্মক হতে পারে।
গত কয়েক বছরে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করছেন যে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা আর শক্তি দুটোই বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের জল আরও গরম হচ্ছে। ফলে ঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে। তাই এখন প্রতিটা মরশুমেই আমাদের বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এবারের পরিস্থিতি কেমন দেখাচ্ছে?
আবহাওয়া বিভাগ জানাচ্ছে যে বঙ্গোপসাগরে এখনই কিছু গোলমাল দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের দক্ষিণ দিকে একটা সম্ভাব্য নিম্নচাপ এলাকা তৈরি হতে পারে বলে সংকেত মিলছে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, কিন্তু পরিস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি নিম্নচাপ তৈরি হয়, তাহলে সেটা শক্তিশালী হওয়ার সমস্ত উপাদান রয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেশি, বাতাসের গতিবিধি অনুকূল – এই সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি একটু উদ্বেগজনক বলাই যায়।
উপকূলবর্তী এলাকার মানুষদের কী করা উচিত?
যারা সমুদ্রের কাছাকাছি থাকেন, তাদের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমত, আবহাওয়ার খবর নিয়মিত শুনতে হবে। টিভি, রেডিও বা মোবাইলে আবহাওয়া বিভাগের সতর্কতা মিস করা যাবে না কোনোভাবেই।
মাছধরা নৌকার মালিকদের সমুদ্রে যাওয়ার আগে অবশ্যই আবহাওয়া চেক করতে হবে। যদি কোনো সতর্কতা জারি করা হয়, তাহলে সাগরে যাওয়া বন্ধ রাখতে হবে। জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই।
ঘরবাড়ি মজবুত করে রাখা দরকার। যেসব জিনিস হাওয়ায় উড়ে যেতে পারে, সেগুলো সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে। জরুরি জিনিসপত্র – যেমন টর্চলাইট, ব্যাটারি, মোমবাতি, দিয়াশলাই, পানীয় জল, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ – এসব প্রস্তুত রাখা ভালো।
সরকার কী করছে?
বৃষ্টি বিদায় নিলেও সাবধান অক্টোবরেই আসতে পারে প্রবল ঘূর্ণিঝড়
প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় আসার আগেই সরকারি স্তরে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগ, পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড, এনডিআরএফ – সবাই তৈরি থাকে। উপকূলবর্তী এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়। যাতে বিপদের সময় মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে।
আবহাওয়া বিভাগও স্যাটেলাইট থেকে প্রতিটা তথ্য দেখছে। রাডার সিস্টেম দিয়ে ঝড়ের গতিবিধি ট্র্যাক করা হচ্ছে। যাতে সময় মতো সতর্কতা জারি করা যায়। এখন আর আগের মতো হঠাৎ করে ঝড় এসে যায় না। কয়েকদিন আগে থেকেই জানা যায় কী হতে পারে।
আমাদের কী মনে রাখা উচিত?
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা যায় না, কিন্তু সাবধান থাকলে ক্ষতি অনেকটা কমানো যায়। অক্টোবর মাস মানেই একটু বেশি সতর্ক থাকার সময়। বৃষ্টি শেষ হয়ে গেছে বলে ভাবলে ভুল হবে। সমুদ্র এখনও শান্ত হয়নি পুরোপুরি।
আবহাওয়ার খবর রাখুন নিয়মিত। সরকারি নির্দেশ মেনে চলুন কোনো দ্বিধা না করে। পরিবারের সবাইকে সচেতন রাখুন। আর সবচেয়ে বড় কথা, আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকুন। প্রস্তুতিই হলো সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
এই অক্টোবর মাসে ঘূর্ণিঝড় আসবে কি আসবে না, সেটা এখনই বলা মুশকিল। তবে সম্ভাবনা আছে। আর তাই উপকূলবর্তী এলাকার মানুষদের পাশাপাশি আমাদের সবারই একটু বেশি সজাগ থাকা দরকার। ঝড় আসুক বা না আসুক, প্রস্তুত থাকলে ক্ষতি হয় অনেক কম। আসুন আমরা সবাই সচেতন থাকি, সতর্ক থাকি।
FAQ
প্রশ্ন ১: অক্টোবর মাসে সত্যিই কি সাইক্লোন আসতে পারে?
👉 হ্যাঁ, হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শক্তিশালী হয়ে সাইক্লোনে রূপ নিতে পারে।
প্রশ্ন ২: কোন কোন জেলায় বেশি প্রভাব পড়তে পারে?
👉 দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী জেলা যেমন — দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও কলকাতায় ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে।
প্রশ্ন ৩: কবে থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যেতে পারে?
👉 সপ্তাহের শেষের দিকে মেঘলা আকাশ ও মাঝেমধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্নচাপ তৈরি হলে পরবর্তী দুই দিনেই প্রভাব বাড়তে পারে।
প্রশ্ন ৪: মানুষকে কী সতর্কতা মানা উচিত?
👉 উপকূল অঞ্চলের মানুষদের হাওয়া অফিসের নির্দেশ মেনে চলা, সমুদ্রে না যাওয়া ও নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: এই সাইক্লোনের নাম কী হতে পারে?
👉 এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা হয়নি, তবে নিম্নচাপ তৈরি হলে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা নাম প্রকাশ করবে।
এটাও দেখুন
👉 বর্ধমান মেডিক্যালে 18 দিনের শিশু চুরি মা-বাবার সামনেই অপহরণ জানুন সম্পূর্ণ ঘটনা
