উত্তরবঙ্গে দুর্যোগ! ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ২৮ মুখ্যমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশ ও সহায়তা মৃতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ

গত কয়েকদিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ফলে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রশাসনের হিসাবে, এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮ জন মানুষের। রাজ্য সরকার মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছে — প্রতি মৃত ব্যক্তির পরিবারকে দেওয়া হবে ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা।
এই দুঃসময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইট করে শোকপ্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন, “আমরা প্রতিটি পরিবারের পাশে আছি। প্রশাসন সর্বশক্তি দিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মৃতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকার নেবে।”
🌧️ বৃষ্টির তাণ্ডব: পাহাড় ও সমতলে বিপর্যয়
দার্জিলিংয়ে গত ৭২ ঘণ্টায় গড়ে ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। একটানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের ঢালে মাটি আলগা হয়ে গেছে, ফলে একের পর এক ভূমিধস ঘটছে। বহু জায়গায় রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জলপাইগুড়ির মালবাজার ও মেটেলি ব্লকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তিস্তা নদীর জল বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে, বহু গ্রাম প্লাবিত। প্রশাসন ইতিমধ্যেই প্রায় ১০,০০০ মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে। ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে বিভিন্ন স্কুল ও সরকারি ভবনে।
🏠 ভূমিধসে ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি ও অসহায় পরিবার
দার্জিলিং শহর থেকে শুরু করে কার্শিয়াং পর্যন্ত অনেক জায়গায় ভূমিধসের ফলে ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। একাধিক পরিবার রাতারাতি গৃহহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,
“রাত একটা নাগাদ হঠাৎ মাটির নিচ থেকে ভয়ানক শব্দ আসে। আমরা সবাই বেরিয়ে দেখি, বাড়ির একাংশ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কোনোভাবে প্রাণে বেঁচেছি।”
এই ঘটনায় একাধিক পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন। প্রশাসন উদ্ধারকাজে নেমেছে, কিন্তু পাহাড়ি এলাকার দুর্গম অবস্থার কারণে কাজ হচ্ছে ধীরগতিতে।
🧑🚒 উদ্ধারকাজে সেনা, এনডিআরএফ ও পুলিশ
দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির দুর্গম এলাকায় এনডিআরএফ (জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী), সেনাবাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের একাধিক টিম মোতায়েন করা হয়েছে। হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার অভিযান চলছে। ভেসে যাওয়া সেতু, কাটা রাস্তা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকা—সব জায়গায় দফায় দফায় অভিযান চলছে।
রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, “প্রাথমিকভাবে ১০টি বিশেষ টিম উদ্ধারকাজে নেমেছে। বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যাহত হলেও আমরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”
💰 মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা: ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন
দুর্যোগের খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে জরুরি বৈঠক করেন। এরপরই তিনি ঘোষণা করেন—
- মৃতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
- গুরুতর আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ও বিনামূল্যে চিকিৎসা।
- গৃহহীন পরিবারগুলিকে অস্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
- কৃষিক্ষেত্রে ও পশুপালনে ক্ষতির জন্য আলাদা ত্রাণ তহবিল গঠন করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান। যাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, আমরা তাঁদের পাশে আছি। কেউ একা নন — প্রশাসন তাঁদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।”
🌾 কৃষকদের বিপদ: জমিতে জল, ফসল নষ্ট
বৃষ্টিপাতের ফলে চা বাগান ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে চা শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। দার্জিলিংয়ের চা বাগানগুলিতে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির জলে জমি ডুবে গেছে, ধান ও ভুট্টার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
একজন স্থানীয় কৃষক জানান,
“আমাদের সব জমি জলের নিচে। এখন যদি রোদ না ওঠে, তাহলে আর কিছুই বাঁচানো যাবে না।”
সরকার ইতিমধ্যেই কৃষি দপ্তরকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্প ঘোষণা করতে পারে বলে সূত্রের খবর।
🏫 স্কুল ও অফিস বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয়
পাহাড়ি এলাকায় বেশ কিছু স্কুল ও কলেজে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। বহু সরকারি দপ্তরও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। দার্জিলিং থেকে সিলিগুড়ি যাওয়ার সড়কপথ ও রেলপথ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েছেন।
বিভিন্ন এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্গত এলাকায় খাদ্য, জল ও ওষুধ বিতরণ শুরু করেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম এলাকায় দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো।
📸 সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ছবি ও ভিডিও
সামাজিক মাধ্যমে ইতিমধ্যেই পাহাড়ের ভয়াবহ দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে। ভূমিধসে রাস্তা ও ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার ভিডিও মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। অনেকেই প্রশাসনের প্রশংসা করছেন দ্রুত তৎপরতার জন্য, আবার কেউ কেউ অবকাঠামোর দুর্বলতার সমালোচনাও করছেন।
⚠️ আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলাগুলিতে আরও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষদের আপাতত নিরাপদ স্থানে থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
❤️ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে ত্রাণ পাঠাচ্ছেন। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, পোশাক ও কম্বল সংগ্রহ করা হচ্ছে দুর্গতদের সাহায্যের জন্য।
একজন কলেজ ছাত্র বলেন,
“আমরা কয়েকজন মিলে ছোট একটা ফান্ড তৈরি করেছি। যতটা পারি সাহায্য করছি। এখন সবাই মিলে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি।”
🗣️ প্রশাসনের বার্তা
রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা দফতর জানিয়েছে, “প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা তৈরি হচ্ছে। যে পরিবারগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছেও অতিরিক্ত সাহায্যের আবেদন জানাবে।”
🙏 মানবিক উদ্যোগের আহ্বান
এই দুর্যোগের মধ্যে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন, কেউ খাবার রান্না করে পাঠাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা সামগ্রী দিচ্ছেন। প্রশাসন মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেছে এবং জানিয়েছে, যেকোনও জরুরি প্রয়োজনে ১০৭০ (ডিজাস্টার হেল্পলাইন) নম্বরে ফোন করা যেতে পারে।
❓ FAQ
প্রশ্ন ১: ভারী বৃষ্টিতে কোন কোন জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
উত্তর: দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
প্রশ্ন ২: সরকার মৃতদের পরিবারকে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে?
উত্তর: প্রতিটি মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: আহতদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: গুরুতর আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ও বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: উদ্ধারকাজে কারা অংশ নিচ্ছেন?
উত্তর: এনডিআরএফ, সেনা, পুলিশ এবং রাজ্য প্রশাসনের টিম উদ্ধার ও ত্রাণকাজে যুক্ত আছে।
প্রশ্ন ৫: এখন পরিস্থিতি কেমন?
উত্তর: বৃষ্টি কিছুটা কমলেও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়ে গেছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।
🔚 উপসংহার
ভারী বৃষ্টিপাত ও ভূমিধস উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনে যে ভয়াবহতা এনেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যেও একতার ছবি ফুটে উঠছে—সরকার, প্রশাসন, সেনা, এনডিআরএফ, স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ মানুষ সবাই একসঙ্গে লড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষতিপূরণের ঘোষণা কিছুটা হলেও আশার আলো জাগিয়েছে দুর্গত পরিবারগুলির মনে।
প্রকৃতির এই ক্রোধ থামার অপেক্ষায় গোটা রাজ্য। সকলের একটাই প্রার্থনা—
বৃষ্টি থামুক, স্বস্তি ফিরে আসুক পাহাড় ও সমতলে।
এটাও দেখুন
👉 ‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি
