‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

Spread the love

‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জনপদ দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি ফের প্রকৃতির প্রলয়ে কেঁপে উঠেছে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ে ব্যাপক ভূমিধস ও বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৮ ছাড়িয়েছে। বহু মানুষ নিখোঁজ, শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাকে ‘মানব নির্মিত দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং প্রশাসনকে দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্য চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

পাহাড়ে আতঙ্কের রাত

গত সপ্তাহ থেকে দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও জলপাইগুড়িতে টানা প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। পাহাড়ের ঢালে মাটি আলগা হয়ে গিয়ে একের পর এক জায়গায় ভূমিধস নেমে আসে। রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ে, নদী উপচে জল ঢোকে জনবসতিতে। মঙ্গলবার রাতে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে কালিম্পং জেলার ঘিস ও রিশি নদীর ধারঘেঁষা এলাকায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ের একাংশ ভেঙে পড়ে গোটা গ্রাম মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়।

উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, বহু মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন, তাঁরা টেরই পাননি কখন পাহাড় নেমে এসেছে। সেনা ও এনডিআরএফ দল রাতভর উদ্ধার অভিযান চালায়। কাদা ও জলের তোড়ে উদ্ধার কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। এখনও পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে।

জলপাইগুড়িতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি

দার্জিলিংয়ের পাশাপাশি সমতলের জলপাইগুড়ি জেলাতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তিস্তা, জয়ন্তী, তোর্সা, ও অন্যান্য পাহাড়ি নদীগুলি ফুলেফেঁপে উপচে পড়েছে। বহু গ্রাম জলের নিচে, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। শহরের রাস্তাঘাট ও সেতু ভেসে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

জলপাইগুড়ির জেলা প্রশাসন জানায়, শুধু এই জেলাতেই প্রায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে শিশু ও প্রবীণও রয়েছেন। অনেক পরিবার সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। স্কুল, পঞ্চায়েত ভবন ও সরকারি অফিসকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিদর্শন ও প্রতিক্রিয়া

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুধবার সকালে হেলিকপ্টারে করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন,
“এটি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মানব নির্মিত বিপর্যয়। পাহাড় কেটে, নদীর গতিপথ বদলে, নির্বিচারে নির্মাণ করার ফলেই আজ প্রকৃতি এইভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছে।”

তিনি জানান, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই বিশেষ ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকার নিচ্ছে।

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম

এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, সেনা ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। হেলিকপ্টার ও বোটের মাধ্যমে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানো হচ্ছে দুর্গম এলাকায়।
পাহাড়ের রাস্তায় কাদা ও পাথর জমে থাকায় বহু জায়গায় যান চলাচল বন্ধ। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষও প্রশাসনের পাশে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

রাজ্য সরকারের এক আধিকারিক জানান, “আমরা দিনরাত কাজ করছি। জল নামলেই ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান জানা যাবে। আপাতত মানুষের জীবন রক্ষাই প্রধান লক্ষ্য।”

পরিবেশবিদদের মতামত

পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে দার্জিলিং ও উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজ এবং বন উজাড় ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দার্জিলিং হিমালয় অঞ্চলে প্রতি বছরই বৃষ্টিপাতের সময় ভূমিধস হয়, কিন্তু এবার তার মাত্রা অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ে রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়ে পাহাড় কাটা, পর্যটনের চাপ বৃদ্ধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবই এই বিপর্যয়কে তীব্র করেছে।

একজন ভূতত্ত্ববিদ বলেন, “আমরা পাহাড়কে যেমনভাবে ক্ষতবিক্ষত করছি, তাতে এ ধরনের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। এখন সময় এসেছে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার।”

ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী:

  • দার্জিলিং জেলায় প্রায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
  • জলপাইগুড়িতে ১২ জন এবং কালিম্পংয়ে অন্তত ২ জন মারা গেছেন।
  • ২০০০ এর বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত।
  • ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়েছে।
  • প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়দের আর্তি

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষেরা বলছেন, তাঁরা এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনও দেখেননি। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন জীবনের সমস্ত সঞ্চয়।
দার্জিলিংয়ের ঘিস গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দা বিমলা তামাং বলেন,
“রাতের দিকে আমরা শুনলাম বিকট শব্দ। তারপর দেখি বাড়ির পেছনের পাহাড় নেমে এসেছে। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। আমার ভাই এখনও নিখোঁজ।”

অন্যদিকে জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা এলাকায় এক চা শ্রমিকের বক্তব্য,
“প্রতিবার বৃষ্টি হলে ভয় লাগে। নদী বাড়ে, ঘর ডোবে। সরকার সাহায্য করুক, কিন্তু এর সমাধানও খুঁজুক।”

প্রশাসনের করণীয়

রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকারকে পাঠানো হবে। বিপর্যস্ত এলাকাগুলির পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণে কড়াকড়ি বিধি চালু করার পরিকল্পনা চলছে।

রাজ্য বন ও পরিবেশ দপ্তরের এক কর্তা বলেন, “আমরা বুঝেছি, শুধু ত্রাণ নয়—প্রতিরোধই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ের পরিবেশ সংরক্ষণ না করলে এই বিপর্যয় বারবার ফিরে আসবে।”

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে শোক ও ক্ষোভে ভরে ওঠে। অনেকেই প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা ও অবিবেচক নির্মাণনীতিকে দায়ী করেন। অন্যদিকে, বহু মানুষ একজোট হয়ে ত্রাণ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। ফেসবুক ও এক্স (টুইটার)-এ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তালিকা প্রকাশ করছে।

পর্যটনে বড় ধাক্কা

দার্জিলিং, কালিম্পং ও দোয়ার্স—এলাকাগুলি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। দুর্ঘটনার ফলে এই মুহূর্তে সমস্ত হোটেল বুকিং বাতিল হচ্ছে। পর্যটকরা আটকে পড়েছেন এমন বহু খবর এসেছে।
পর্যটন দপ্তর জানিয়েছে, আপাতত পাহাড়ের দিকে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটন স্থলগুলি বন্ধ থাকবে।

মমতার বার্তা

‘প্রাকৃতিক নয় মানবিক অপরাধ’ মমতার বক্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীর উদ্দেশে বলেন,
“এখন রাজনীতি নয়, মানবতার সময়। যারা বিপদে পড়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ান। রাজ্য সরকার সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে।”
তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও সহায়তা চেয়েছেন, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট পুনর্গঠনের জন্য।

মানব নির্মিত না প্রাকৃতিক?

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখন বিতর্ক শুরু হয়েছে—এই বিপর্যয় প্রকৃতির দোষ, না মানুষের অবিবেচনার ফল? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য ‘মানব নির্মিত দুর্যোগ’—এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণের অভাব, অবৈধ পাহাড় কাটা, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নিকাশির ব্যবস্থা না থাকা—সবকিছু মিলেই যেন এক বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা

এই বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সহাবস্থানই বাঁচার পথ। পাহাড় আমাদের সম্পদ, কিন্তু তার ভারসাম্য নষ্ট করলে তার ফল ভয়াবহ হয়।
পরিবেশবান্ধব নীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং সচেতনতা—এই তিনই ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে পারে।

FAQ

১. দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভূমিধস ও বন্যায় কতজন মারা গেছেন?
সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৮ ছাড়িয়েছে, তবে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

২. মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী বলেছেন?
তিনি বলেছেন, এই বিপর্যয় শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, এটি ‘মানব নির্মিত দুর্যোগ’। পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ ও বন ধ্বংস এর বড় কারণ।

৩. উদ্ধার ও ত্রাণের বর্তমান অবস্থা কী?
এনডিআরএফ, সেনা ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্য চালাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

৪. পর্যটন কি প্রভাবিত হয়েছে?
হ্যাঁ, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির পর্যটন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। হোটেল বুকিং বাতিল হচ্ছে এবং পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে।

৫. ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ রোধে সরকার কী করছে?
রাজ্য সরকার পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা করছে এবং পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

৬. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের কী সাহায্য দেওয়া হচ্ছে?
মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার সমস্ত খরচ রাজ্য সরকার বহন করছে।

৭. এই দুর্যোগের প্রধান কারণ কী বলে মনে করা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, অবৈধ নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চাপই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।

উপসংহার

দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মানুষের চোখে এখন শুধু ভয়, ক্ষতি আর অপেক্ষা—কবে আবার তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
প্রকৃতি যেন আমাদের আবার একবার সতর্ক করে দিল, তার সীমা অতিক্রম করলেই সে নির্মম হয়ে ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই যেন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক শোনায়—
“এই দুর্যোগ শুধু পাহাড়ের নয়, আমাদের সকলের জন্য শিক্ষা। মানবের হাতেই প্রকৃতির রক্ষা বা বিনাশ—পছন্দ আমাদের।”

এটাও দেখুন

👉 যে দার্জিলিং একদিন ছিল পরীর দেশ আজ সেখানে প্লাস্টিকের পাহাড়—দায় কার?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *